অবহট্ঠ (Abahatta) ভারতীয় আর্য ভাষার বিবর্তনের ইতিহাসে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, রূপান্তরকালীন এবং সন্ধিক্ষণের ভাষা। ভাষাবিজ্ঞানের পরিভাষায়, এটি মূলত মধ্য ভারতীয় আর্য ভাষার (Middle Indo-Aryan) একেবারে শেষ স্তর এবং নব্য ভারতীয় আর্য ভাষার (New Indo-Aryan) উন্মেষকালীন আদি স্তরের মধ্যবর্তী একটি সংযোগকারী বা সেতুবন্ধনকারী ভাষা। খ্রিষ্টীয় ষষ্ঠ শতক থেকে চতুর্দশ শতক পর্যন্ত ভারতীয় উপমহাদেশের পূর্ব অঞ্চলে, বিশেষ করে বাংলা, বিহার, উড়িষ্যা এবং আসামে এই ভাষার ব্যাপক প্রচলন ও বিকাশ ঘটেছিল [Chatterji, Suniti Kumar, The Origin and Development of the Bengali Language, 1926]। বাংলা, অসমীয়া, ওড়িয়া, মৈথিলি এবং ভোজপুরির মতো আধুনিক পূর্ব ভারতীয় ভাষাগুলোর সরাসরি পূর্বপুরুষ হিসেবে অবহট্ঠ ভাষাকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। প্রাচীন বৈদিক সংস্কৃত থেকে প্রাকৃত এবং অপভ্রংশ হয়ে বাংলা ভাষায় রূপান্তরের যে সুদীর্ঘ ভাষাতাত্ত্বিক যাত্রা, তার ঠিক পূর্ববর্তী ধাপই হলো অবহট্ঠ। এটি কেবল একটি কথ্য ভাষাই ছিল না, বরং সমকালীন সাহিত্যের একটি সমৃদ্ধ মাধ্যম হিসেবেও ব্যবহৃত হয়েছিল।
‘অবহট্ঠ’ শব্দের উৎপত্তি ও নামকরণ
ভাষাতাত্ত্বিক এবং ব্যুৎপত্তিগত দিক থেকে ‘অবহট্ঠ’ শব্দটি সংস্কৃত ‘অপভ্রষ্ট’ শব্দ থেকে উদ্ভূত হয়েছে। সংস্কৃত ‘অপভ্রষ্ট’ (অর্থ: যা ভ্রষ্ট হয়েছে বা বিকৃত হয়েছে) শব্দটি প্রাকৃত ভাষায় রূপান্তরিত হয়ে ‘অপভট্ঠ’ রূপ ধারণ করে এবং সেখান থেকেই কালক্রমে ধ্বনি পরিবর্তনের মাধ্যমে ‘অবহট্ঠ’ শব্দের জন্ম হয় [Sen, Sukumar, Bhashar Itibritta, 1993]। প্রাচীন সংস্কৃত বৈয়াকরণরা এবং পণ্ডিত সমাজ মূলত সমাজের সাধারণ ও নিম্নশ্রেণির মানুষের মুখের ভাষাকে তাচ্ছিল্য করে ‘অপভ্রষ্ট’ বা ‘অপভ্রংশ’ বলতেন, কারণ তা ছিল ব্যাকরণের কঠোর নিয়মশৃঙ্খলা থেকে মুক্ত এবং সংস্কৃতের তুলনায় অনেকটাই বিকৃত বা সরলীকৃত। কিন্তু পণ্ডিতদের এই তাচ্ছিল্য সত্ত্বেও, সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম হিসেবে এই অপভ্রংশ এবং পরবর্তীকালে অবহট্ঠ ভাষাই সমগ্র ভারতবর্ষে জনপ্রিয়তা লাভ করে। একাদশ শতকের প্রখ্যাত প্রাকৃত বৈয়াকরণ পুরুষোত্তম তাঁর ‘প্রাকৃতানুশাসন’ গ্রন্থে এই ভাষাকে ‘অবহট্ঠ’ নামে অভিহিত করেছেন। আধুনিক ভাষাবিজ্ঞানীরা অবহট্ঠকে মূলত ‘পরবর্তী অপভ্রংশ’ (Late Apabhramsa) বা অপভ্রংশের অবক্ষয়িত রূপ হিসেবেই সংজ্ঞায়িত করে থাকেন।
ভাষাতাত্ত্বিক বিবর্তনের ধারা ও অবহট্ঠের অবস্থান
বাংলাসহ অন্যান্য নব্য ভারতীয় আর্য ভাষাগুলোর জন্ম রাতারাতি হয়নি; এর পেছনে রয়েছে হাজার বছরের বিবর্তনের ইতিহাস। এই বিবর্তন প্রক্রিয়াকে প্রধানত তিনটি স্তরে ভাগ করা যায়: প্রাচীন ভারতীয় আর্য ভাষা (খ্রি.পূ. ১৫০০ – খ্রি.পূ. ৬০০), মধ্য ভারতীয় আর্য ভাষা (খ্রি.পূ. ৬০০ – ১০০০ খ্রিষ্টাব্দ) এবং নব্য ভারতীয় আর্য ভাষা (১০০০ খ্রিষ্টাব্দ – বর্তমান)। অবহট্ঠের অবস্থান মূলত মধ্য ভারতীয় আর্য ভাষার একেবারে শেষ পর্যায়ে [Majumdar, R. C., History of Bengal, Vol-I, 1943]।
বিবর্তনের ধারাটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রাচীন বৈদিক বা ছান্দস ভাষা থেকে কালক্রমে ধ্রুপদী সংস্কৃত ভাষার উদ্ভব ঘটে। অন্যদিকে, সাধারণ মানুষের মুখের ভাষা পরিবর্তিত হয়ে পালি, শৌরসেনী, মাগধী, মহারাষ্ট্রী ইত্যাদি প্রাকৃত ভাষার জন্ম দেয়। খ্রিষ্টীয় প্রথম সহস্রাব্দের মাঝামাঝি সময়ে এই প্রাকৃত ভাষাগুলো আরও পরিবর্তিত ও সরলীকৃত হয়ে ‘অপভ্রংশ’ স্তরে প্রবেশ করে। ভারতের পূর্বাঞ্চলে (মগধ বা বিহার অঞ্চলে) যে অপভ্রংশ প্রচলিত ছিল, তাকে ‘মাগধী অপভ্রংশ’ বলা হয়। ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতে, এই মাগধী অপভ্রংশই খ্রিষ্টীয় নবম থেকে একাদশ শতকের মধ্যে আরও বিকশিত ও পরিবর্তিত হয়ে একটি নতুন রূপ ধারণ করে, যাকে ‘মাগধী অবহট্ঠ’ বা সংক্ষেপে অবহট্ঠ বলা হয়। এই অবহট্ঠ স্তর পার হয়েই খ্রিষ্টীয় দশম-একাদশ শতাব্দীতে প্রাচীন বাংলা ভাষার উন্মেষ ঘটে। সুতরাং বিবর্তনের রেখাচিত্রটি দাঁড়ায়: মাগধী প্রাকৃত -> মাগধী অপভ্রংশ -> অবহট্ঠ -> প্রাচীন বাংলা [Chatterji, Suniti Kumar, The Origin and Development of the Bengali Language, 1926]।
সময়কাল ও ভৌগোলিক বিস্তার
ঐতিহাসিক এবং ভাষাতাত্ত্বিক প্রমাণাদি পর্যালোচনা করে পণ্ডিতগণ অবহট্ঠ ভাষার একটি সুনির্দিষ্ট সময়কাল নির্ধারণ করেছেন। যদিও খ্রিষ্টীয় ষষ্ঠ শতক থেকেই অপভ্রংশের মধ্যে অবহট্ঠের কিছু কিছু লক্ষণ প্রকাশ পেতে শুরু করেছিল, তবে নবম শতক থেকে একাদশ শতক পর্যন্ত সময়কালকে অবহট্ঠ ভাষার ‘স্বর্ণযুগ’ বা পূর্ণ বিকাশের কাল হিসেবে ধরা হয়। একাদশ শতকের পর থেকে এটি ধীরে ধীরে ক্ষয়প্রাপ্ত হতে থাকে এবং এর খোলস থেকেই আধুনিক আঞ্চলিক ভাষাগুলোর জন্ম হয়। তবে সাহিত্যের ভাষা হিসেবে চতুর্দশ শতক পর্যন্ত অবহট্ঠ তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছিল।
ভৌগোলিক বিস্তারের দিক থেকে অবহট্ঠ কেবল কোনো একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে সীমাবদ্ধ ছিল না। সমগ্র পূর্ব ভারত—বর্তমান বিহার (মগধ, মিথিলা, ভোজপুর), পশ্চিমবঙ্গ, বাংলাদেশ, আসাম এবং উড়িষ্যার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে এই ভাষা জনসাধারণের যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম বা ‘লিঙ্গুয়া ফ্রাঙ্কা’ (Lingua franca) হিসেবে ব্যবহৃত হতো। এমনকি পশ্চিমা অপভ্রংশের প্রভাবে ভারতের অন্যান্য অঞ্চলেও অবহট্ঠের একটি সর্বভারতীয় রূপ প্রচলিত ছিল, যা চারণকবি এবং বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যরা ব্যবহার করতেন।
ভাষাতাত্ত্বিক ও ব্যাকরণগত বৈশিষ্ট্য
সংস্কৃত এবং প্রাকৃতের তুলনায় অবহট্ঠ ভাষার ব্যাকরণ এবং ধ্বনিতত্ত্ব ছিল অনেক বেশি সরল এবং নমনীয়। একটি ‘সংশ্লেষণাত্মক’ (Synthetic) ভাষা থেকে ‘বিশ্লেষণাত্মক’ (Analytic) ভাষায় রূপান্তরিত হওয়ার সুস্পষ্ট প্রমাণ অবহট্ঠের মধ্যেই প্রথম দেখা যায়। অবহট্ঠ ভাষার প্রধান ভাষাতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যগুলো নিচে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো [Sen, Sukumar, Bhashar Itibritta, 1993]:
- ধ্বনিগত পরিবর্তন (Phonological Changes): অবহট্ঠের ধ্বনিতত্ত্বে ব্যাপক সরলীকরণ ঘটেছিল। সংস্কৃতের বহু যুক্তব্যঞ্জন এই স্তরে এসে সমীকরণের (Assimilation) মাধ্যমে দ্বিত্ব ব্যঞ্জনে পরিণত হয় এবং পরবর্তীতে ধ্বনি পরিবর্তনের নিয়মানুযায়ী পূর্ববর্তী স্বরধ্বনিটি দীর্ঘ হয়ে যায় (যেমন: ধর্ম > ধম্ম > ধাম)। এছাড়া নাসিক্যীভবনের (Nasalization) প্রবণতা অবহট্ঠ ভাষায় অত্যন্ত প্রবল ছিল। পদান্তের ‘ম’ বা ‘ন’ লুপ্ত হয়ে পূর্ববর্তী স্বরধ্বনিটি অনুনাসিক রূপ লাভ করত।
- রূপতাত্ত্বিক পরিবর্তন (Morphological Changes): সংস্কৃত ভাষায় শব্দের রূপ বা বিভক্তির (Declension and Conjugation) জটিলতা ছিল অত্যন্ত বেশি। অবহট্ঠ পর্যায়ে এসে এই জটিল বিভক্তি ব্যবস্থা প্রায় ভেঙে পড়ে। সংস্কৃতের আটটি কারক মাত্র দুই বা তিনটি মূল রূপে (Direct, Oblique, and Vocative) সংকুচিত হয়ে যায়। কারক-বিভক্তির এই অভাব পূরণের জন্য অবহট্ঠ ভাষায় প্রথমবারের মতো বিভিন্ন ‘অনুসর্গ’ (Postpositions) এবং ‘সহায়ক ক্রিয়া’ (Auxiliary Verbs)-এর ব্যবহার শুরু হয়, যা আধুনিক বাংলা ভাষার অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য।
- বচন ও লিঙ্গভেদ: সংস্কৃত ভাষায় একবচন, দ্বিবচন ও বহুবচন—এই তিন ধরনের বচন ছিল। অবহট্ঠ ভাষায় দ্বিবচনের অস্তিত্ব সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে যায় এবং কেবল একবচন ও বহুবচন টিকে থাকে। একইভাবে, ব্যাকরণগত লিঙ্গভেদের (Grammatical Gender) কঠোর নিয়মকানুন শিথিল হয়ে যায়।
- শব্দভাণ্ডার (Vocabulary): অবহট্ঠ ভাষার শব্দভাণ্ডারে ‘তদ্ভব’ শব্দের প্রাধান্য ছিল সবচেয়ে বেশি। অর্থাৎ, যেসব সংস্কৃত শব্দ প্রাকৃতের মাধ্যমে পরিবর্তিত হয়ে নতুন রূপ লাভ করেছে, সেগুলোই অবহট্ঠের মূল ভিত্তি ছিল। এর পাশাপাশি এই স্তরে প্রচুর ‘দেশি’ শব্দ (অস্ট্রিক ও দ্রাবিড় ভাষা থেকে আগত) অবহট্ঠ শব্দভাণ্ডারে প্রবেশ করে, যা পরবর্তীকালে বাংলা ভাষার শব্দভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেছে।
সাহিত্যিক নিদর্শন ও ঐতিহাসিক প্রমাণ
অবহট্ঠ ভাষার সাহিত্যিক নিদর্শন প্রাচীন ভারতীয় সাহিত্যের এক অমূল্য সম্পদ। বহু বিখ্যাত কবি এবং পণ্ডিত এই ভাষায় সাহিত্য রচনা করেছেন। অবহট্ঠ সাহিত্যের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য এবং উল্লেখযোগ্য নিদর্শনগুলো হলো:
- দোহাকোষ (Dohakosh): বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্য সরহপাদ, কাহ্নপাদ এবং তিল্লোপাদের রচিত ‘দোহাকোষ’ হলো অবহট্ঠ ভাষার অন্যতম প্রাচীন নিদর্শন। খ্রিষ্টীয় নবম থেকে একাদশ শতকের মধ্যে রচিত এই দোহা বা ধর্মীয় গাথাগুলোতে সমকালীন সমাজ, ধর্মীয় দর্শন এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা অত্যন্ত সুন্দরভাবে অবহট্ঠ ভাষায় ফুটে উঠেছে [Dasgupta, Shashibhusan, Obscure Religious Cults, 1946]।
- প্রাকৃত পৈঙ্গল (Prakrita Paingala): চতুর্দশ শতকে সংকলিত এই ছন্দোশাস্ত্র বিষয়ক গ্রন্থটি অবহট্ঠ ভাষার একটি বিশাল আকরগ্রন্থ। এই গ্রন্থে বিভিন্ন অজ্ঞাতনামা কবির লেখা অসংখ্য অবহট্ঠ কবিতা সংকলিত হয়েছে, যেখানে রাজপুত বীরদের বীরত্বগাথা, প্রেম এবং সাধারণ জীবনের চিত্র বর্ণিত হয়েছে।
- সন্দেশ রাসক (Sandesh Rasak): দ্বাদশ-ত্রয়োদশ শতকে আব্দুল রহমান (আদ্দহমাণ) নামক এক মুসলিম কবি ‘সন্দেশ রাসক’ নামক একটি অসাধারণ খণ্ডকাব্য রচনা করেন। এটি পশ্চিমা অবহট্ঠের একটি চমৎকার উদাহরণ, যেখানে এক বিরহী নারীর তার স্বামীর কাছে সংবাদ প্রেরণের আকুলতা বর্ণিত হয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে, অবহট্ঠ ভাষা কেবল একটি নির্দিষ্ট ধর্মের মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না।
- বিদ্যাপতির সাহিত্যকর্ম: পঞ্চদশ শতকের প্রখ্যাত মৈথিলি কবি বিদ্যাপতি তাঁর বিখ্যাত ঐতিহাসিক কাব্য ‘কীর্তিলতা’ (Kirtilata) এবং ‘কীর্তিপতাকা’ (Kirtipataka) অবহট্ঠ ভাষায় রচনা করেছিলেন। বিদ্যাপতি তাঁর ‘কীর্তিলতা’ গ্রন্থে অবহট্ঠ ভাষার প্রশংসা করে একটি অমর উক্তি করেছেন: “দেসিল বঅনা সব জন মিট্ঠা / তেঁ তৈসন জম্পও অবহট্ঠা।” (অর্থাৎ: দেশি ভাষা বা মাতৃভাষা সকল মানুষের কাছেই মিষ্টি লাগে, আর সেই জন্যই আমি অবহট্ঠ ভাষায় গ্রন্থ রচনা করছি) [Majumdar, Bimanbehari, Vidyapati, 1965]। এই উক্তিটি প্রমাণ করে যে, সে যুগে সংস্কৃতের মতো অভিজাত ভাষার চেয়ে অবহট্ঠের মতো দেশি ভাষাই মানুষের হৃদয়ের বেশি কাছাকাছি ছিল।
- চর্যাপদ ও অবহট্ঠ: বাংলা ভাষার প্রাচীনতম নিদর্শন ‘চর্যাপদ’-এর ভাষাকে ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় ‘প্রাচীন বাংলা’ বললেও, আধুনিক অনেক পণ্ডিত মনে করেন যে চর্যার ভাষার সাথে অবহট্ঠের অত্যন্ত গভীর ও অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক রয়েছে। চর্যার ব্যাকরণ এবং শব্দভাণ্ডারে অবহট্ঠের প্রচুর প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। মূলত অবহট্ঠ ভাষার গর্ভ থেকেই চর্যাপদের ভাষার জন্ম হয়েছে।
বাংলা ভাষার উদ্ভব ও অবহট্ঠের ঐতিহাসিক তাৎপর্য
বাংলা ভাষার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং অবহট্ঠ ভাষারই একটি যৌক্তিক ও স্বাভাবিক পরিণতি। একাদশ-দ্বাদশ শতকে অবহট্ঠ ভাষার কাঠামোগত দুর্বলতা ও শিথিলতার সুযোগেই মগধ অঞ্চলের পূর্ব প্রান্তে (গৌড় ও বঙ্গদেশে) একটি নতুন আঞ্চলিক রূপের জন্ম হতে থাকে, যা কালক্রমে বাংলা ভাষা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মতে, গৌড়ীয় অপভ্রংশ বা গৌড়ীয় অবহট্ঠ থেকেই সরাসরি বাংলা ভাষার উৎপত্তি ঘটেছে [Shahidullah, Muhammad, Bangla Bhashar Itibritta, 1959]।
অবহট্ঠ কেবল একটি ভাষাই ছিল না, এটি ছিল একটি বিশাল সাংস্কৃতিক ও সামাজিক আন্দোলনের হাতিয়ার। প্রাচীন ভারতের কঠোর ব্রাহ্মণবাদী সমাজব্যবস্থা এবং সংস্কৃত ভাষার একচেটিয়া আধিপত্যকে ভেঙে সাধারণ মানুষের মুখের ভাষাকে সাহিত্যের মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রে অবহট্ঠের ভূমিকা অপরিসীম। বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্য এবং নাথ যোগীরা তাঁদের ধর্মীয় মতবাদ প্রচারের জন্য ইচ্ছাকৃতভাবেই সংস্কৃত পরিহার করে অবহট্ঠ ভাষাকে বেছে নিয়েছিলেন, যাতে সমাজের একেবারে নিম্নস্তরের মানুষের কাছে পৌঁছানো যায়।
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, ভারতীয় আর্য ভাষার দীর্ঘ ও বৈচিত্র্যময় বিবর্তনের ইতিহাসে অবহট্ঠ একটি অপরিহার্য অধ্যায় বা মাইলফলক। প্রাচীন যুগের সংশ্লেষণাত্মক ভাষা থেকে আধুনিক যুগের বিশ্লেষণাত্মক ভাষায় উত্তরণের যে জটিল প্রক্রিয়া, তা অবহট্ঠ ভাষার মধ্য দিয়েই পূর্ণতা লাভ করেছে। বাংলা, অসমীয়া, মৈথিলি বা ওড়িয়া—আজকের দিনে পূর্ব ভারতের এই সমৃদ্ধ ভাষাগুলোর প্রত্যেকেই অবহট্ঠের কাছে ঋণী, কারণ এই অবহট্ঠের বুকেই নিহিত ছিল তাদের মাতৃভাষা হওয়ার মূল বীজ। বিদ্যাপতি, সরহপাদ কিংবা আব্দুল রহমানের মতো কবিদের অমর সৃষ্টির মধ্য দিয়ে অবহট্ঠ ভাষা আজও ভাষাবিজ্ঞানী এবং সাহিত্যপ্রেমীদের কাছে এক গভীর গবেষণার বিষয় হয়ে আছে। বাংলা ভাষার শেকড় অনুসন্ধান করতে হলে অবহট্ঠের এই সুদীর্ঘ ও ঐশ্বর্যমণ্ডিত ঐতিহ্যের দিকে ফিরে তাকাতেই হবে, যা আমাদের মাতৃভাষার প্রাচীনত্ব এবং আভিজাত্যের সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক প্রমাণ।