যাত্রা

যাত্রা বাংলাদেশের লোকজ ও মৌলিক সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য এবং ঐতিহ্যবাহী অঙ্গ। এটি মূলত লোকনাট্যের একটি জনপ্রিয় শাখা, যেখানে ঐতিহ্যমন্ডিত কোনো লোকবিষয়কে নাট্যরূপ দিয়ে অভিনয় প্রদর্শন করা হয়। খোলা আসরে সোচ্চার কণ্ঠে অতিরিক্ত অঙ্গসঞ্চালনের মাধ্যমে অভিনয়, সঙ্গীত ও বাদ্যের সমন্বয়ে এই শিল্প এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছে। ‘যাত্রা’ শব্দটির শাব্দিক অর্থ গমন বা কোনো স্থানে যাওয়ার উদ্দেশ্যে পদক্ষেপ গ্রহণ। ধারণা করা হয়, অতীতে দেবদেবীর উৎসব বা রথযাত্রার মতো ধর্মীয় শোভাযাত্রা থেকে এই শিল্পরীতির উদ্ভব। কালক্রমে এই শোভাযাত্রার সাথে নৃত্য ও গীত যুক্ত হয়ে তা লোকনাট্যের রূপ ধারণ করে। যাত্রা কেবল একটি বিনোদন মাধ্যম নয়, বরং এটি বাংলার সাধারণ মানুষের জীবন, ধর্ম, প্রেম ও সংগ্রামের এক জীবন্ত দলিল।

যাত্রার বিবর্তন ও বিকাশের ইতিহাস অত্যন্ত দীর্ঘ। প্রাচীনকালে মূলত শিবোৎসব ও কৃষ্ণোৎসবকে কেন্দ্র করে যাত্রার সূচনা হয়েছিল। চৈতন্যদেবের সময়কালে বৈষ্ণব ধর্মের প্রসারের সাথে সাথে ‘কৃষ্ণযাত্রা’ গ্রাম-বাংলার প্রতিটি জনপদে ব্যাপ্তি লাভ করে। অষ্টাদশ শতাব্দী নাগাদ যাত্রা সাহিত্যের ভিত্তি আরও মজবুত হয়, যেখানে শিশুরাম বা সুবল দাসের মতো কিংবদন্তি শিল্পীদের নাম পাওয়া যায়। উনিশ শতকে এই শিল্পধারায় পৌরাণিক কাহিনীর প্রাধান্য দেখা দেয়। বিশ শতকের শুরুর দিকে দেশপ্রেমিক মুকুন্দ দাস যাত্রাকে কেবল বিনোদনের গণ্ডি থেকে বের করে এনে রাজনৈতিক মুক্তিসংগ্রাম ও সমাজ সংস্কারের হাতিয়ার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ ও ভারতভাগের মতো সামাজিক বিপর্যয়ের কালে যাত্রা নবরূপ ধারণ করে এবং আধুনিক অভিনয় শৈলীর দিকে ধাবিত হয়।

যাত্রাদল গঠন ও পরিচালনা একটি অত্যন্ত সুসংগঠিত প্রক্রিয়া। একজন স্বত্বাধিকারী বা ‘অধিকারী’ থাকেন এই দলের সর্বময় কর্তা। একটি বড় যাত্রাদল গড়ে তোলার জন্য বিপুল পরিমাণ পুঁজির প্রয়োজন হয়, কারণ দলের সদস্য সংখ্যা সাধারণত ৫০ থেকে ৬০ জনের মতো হয়ে থাকে। এই দলের মধ্যে অভিনেতা-অভিনেত্রী, নৃত্যশিল্পী, যন্ত্রী, ড্রেসম্যান, প্রম্পটার থেকে শুরু করে বাবুর্চি ও পরিচারক পর্যন্ত এক বিশাল কর্মীবাহিনী থাকে। যাত্রাশিল্পের মান অনেকাংশেই প্রধান অভিনেতা-অভিনেত্রী ও নৃত্যশিল্পীদের দক্ষতার ওপর নির্ভর করে। সাধারণত কৃষিকাজের অবসর সময়, অর্থাৎ শ্রাবণ থেকে আশ্বিন মাস পর্যন্ত যাত্রার মৌসুম চলে, তবে অনেক ক্ষেত্রে ফাল্গুন মাস পর্যন্ত অভিনয়ের ধারা অব্যাহত থাকে। দুর্গোৎসব বা বিভিন্ন গ্রাম্য মেলা উপলক্ষে যাত্রার প্যান্ডেলগুলো প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে।

যাত্রার মঞ্চসজ্জা ও পরিবেশনা রীতি অত্যন্ত চমৎকার ও ঐতিহ্যবাহী। মাঠ বা হাটবাজারের খোলা জায়গায় বাঁশ ও টিন দিয়ে তৈরি করা হয় প্যান্ডেল, আর তার ঠিক মাঝখানে থাকে অপেক্ষাকৃত উঁচু খোলা মঞ্চ। এই মঞ্চের চারপাশে দর্শক বসে অভিনয় উপভোগ করেন, যা দর্শকদের সাথে শিল্পীদের এক নিবিড় মানসিক সংযোগ স্থাপন করে। বাদ্যযন্ত্রীদের অবস্থান থাকে মঞ্চের দুই পাশে। আসর জমে উঠলে ঘণ্টা বা হুইসেলের সংকেতে অভিনয়ের শুরু হয়। মহিলা শিল্পীদের উদ্বোধনী সঙ্গীত ও নৃত্যের মধ্য দিয়ে কাহিনীর সূচনা ঘটে, এরপর পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন অঙ্কের অভিনয় চলে। গভীর রাত থেকে ভোর পর্যন্ত অবিরাম চলতে থাকা এই শিল্পকর্মটি দর্শককে এক জাদুকরী জগতে নিয়ে যায়। আগে মন্দিরা, বাঁশি ও ঢোল ব্যবহৃত হলেও বর্তমানে হারমোনিয়াম, তবলা, ড্রাম, বেহালা ও কর্নেটের মতো আধুনিক বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার যাত্রায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

আধুনিক সময়ে বিনোদনের নানা ডিজিটাল মাধ্যমের প্রভাবে যাত্রার চাহিদা কিছুটা হ্রাস পেলেও, এর বিষয়বস্তু ও গুণগত মান ক্রমাগত পরিবর্তিত হচ্ছে। এখন কেবল পৌরাণিক কাহিনী নয়, বরং সামাজিক সমস্যা, সমসাময়িক রাজনীতি, দেশাত্মবোধ ও সাহিত্যনির্ভর কাহিনীও যাত্রার মাধ্যমে মঞ্চস্থ হচ্ছে। পোশাক-পরিচ্ছদ, আলোকসজ্জা ও মঞ্চসজ্জায় আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়া লেগেছে, যা এই শিল্পকে আধুনিক দর্শকদের কাছেও গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে। বাচনভঙ্গি ও বাদ্যযন্ত্রের ক্ষেত্রেও এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। যদিও এখন অনেক আধুনিক সুযোগ-সুবিধা যোগ হয়েছে, তবুও গ্রামের প্রশস্ত মাঠ বা খোলা ময়দানে আধো আলো-অন্ধকারে শত শত দর্শকের গভীর মনোযোগে যাত্রা উপভোগ করার দৃশ্যটি আজও বাংলার গ্রামীন সংস্কৃতির এক অসাধারণ রূপ।

পরিশেষে বলা যায়, যাত্রা কেবল একটি শিল্পমাধ্যম নয়, বরং এটি বাংলার লোকমানসের প্রতিচ্ছবি। বৃহত্তর যশোর, খুলনা, ফরিদপুর, বরিশাল, রাজশাহী, দিনাজপুর, ময়মনসিংহ ও সিলেট অঞ্চলে এখনো এই শিল্পের ব্যাপক জনপ্রিয়তার প্রমাণ পাওয়া যায়। হাজার বছরের ঐতিহ্য ধারণ করে থাকা যাত্রা আজও আমাদের মৌলিক সংস্কৃতির শিকড়কে ধরে রেখেছে। যুগের পরিবর্তনের সাথে সাথে রুচি বদলালেও যাত্রার আবেদন পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখা কেবল বিনোদনের জন্য নয়, বরং আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য অত্যন্ত জরুরি। যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতা পেলে আধুনিক বিষয়ের সংমিশ্রণে যাত্রা পুনরায় বাংলার প্রতিটি প্রান্তে তার হৃত গৌরব পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হবে। এটি এমন এক শিল্প, যা প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে আমাদের শিকড়ের টান অনুভব করায়।