অপুষ্টি শাব্দিক অর্থে শরীরের স্বাভাবিক বৃদ্ধি, বিকাশ ও সুস্থতার জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টির ঘাটতি (undernutrition) ও আধিক্য (overnutrition) দুটোকেই বুঝালেও, সাধারণত পুষ্টির ঘাটতিজনিত অবস্থা বুঝাতেই শব্দটি সচরাচর ব্যবহৃত হয়। খাদ্যে এক বা একাধিক উপাদানের, বিশেষ করে আমিষের স্বল্পতা বা সুষম খাদ্যের দীর্ঘ অভাবই অপুষ্টির প্রধান কারণ। গত কয়েক দশকে বাংলাদেশে দানাশস্য, ডাল, শাকসবজি, ফল, মাছ, মাংস, দুধ ও তেল গ্রহণের পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পেয়েছে। ১৯৬২-৬৪ সালের তুলনায় ১৯৯১-৯২ সালে দানাশস্য ও ডাল গ্রহণ ৫৪৬ গ্রাম থেকে কমে ৪২৭ গ্রামে এবং শাকসবজি গ্রহণের হারও উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। পুষ্টির এই সার্বিক ঘাটতি কেবল ব্যক্তিগত সমস্যা নয়, বরং পুরো সমাজ ও জাতির জন্য এক বড় ধরনের উদ্বেগ।
অপুষ্টির কারণ শুধু সীমিত ক্রয়ক্ষমতা নয়, বরং এর মূলে রয়েছে বহুমুখী জটিলতা। বয়োবৃদ্ধ বা দীর্ঘস্থায়ী অসুখে ভোগা ব্যক্তির অরুচি, খাদ্য গলাধঃকরণের সমস্যা (যেমন—গলা বা গলনালীর ক্যানসার), পরিপাকতন্ত্রের রোগ (পাকস্থলী বা অগ্ন্যাশয়ের সমস্যা), পুষ্টি শোষণে অক্ষমতা (উদরাময়) এবং বিপাকীয় ত্রুটি (যকৃৎ বা ডায়াবেটিস) অপুষ্টির পথ প্রশস্ত করে। পাশাপাশি পুষ্টি বিষয়ক জ্ঞানের অভাব, খাদ্য সম্পর্কে কুসংস্কার, চিরাচরিত খাদ্যাভ্যাস, অবৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ায় খাদ্য রান্না এবং পরিবারের সদস্যদের মধ্যে পক্ষপাতমূলক খাদ্য বণ্টন অপুষ্টির হারকে ত্বরান্বিত করে। এছাড়া খাদ্যে ব্যাপক ভেজাল এবং শিশুদের পেটে কৃমির সংক্রমণ পুষ্টিগত মানের চরম অবনতি ঘটাচ্ছে। ফলে জনসংখ্যার প্রায় ৬৯ শতাংশ আয়োডিনের অভাবে ভুগছে এবং ৫ লক্ষ মানুষ আয়োডিনের অভাবজনিত মানসিক জড়তায় আক্রান্ত।
শিশুদের ক্ষেত্রে অপুষ্টির চিত্রটি আরও ভয়াবহ। যদিও বাংলাদেশ ধান ও গম উৎপাদনে অনেকাংশে স্বয়ংসম্পূর্ণ, কিন্তু মা-বাবার ক্রয় ক্ষমতার সীমাবদ্ধতার কারণে শিশুরা সুষম ও পুষ্টিকর খাবার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। শিশুদের খাদ্যাভাবের চরম বহিঃপ্রকাশ হলো কোয়াশিওরকর ও ম্যারাসমাস। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রায় ৪৮ শতাংশ শিশু কোনো না কোনো মাত্রার অপুষ্টিতে আক্রান্ত। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মৃত্যুর ৫০-৬০ শতাংশের পেছনে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কারণ হিসেবে অপুষ্টি কাজ করে। লিঙ্গবৈষম্যগত বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ছেলেদের তুলনায় মেয়েরা এবং শহরের তুলনায় গ্রামের শিশুরা অধিক অপুষ্ট। এছাড়া গর্ভবতী ও দুগ্ধদাত্রী মায়েদের ৮০ শতাংশই আয়রন ও ফলিক এসিডের অভাবে রক্তশূন্যতায় ভুগছেন, যা নবজাতকের স্বল্প ওজনের অন্যতম কারণ।
বাংলাদেশে অপুষ্টির একটি বিশেষ দিক হলো ‘এ’ ভিটামিনের অভাব। একসময় রাতকানা রোগের প্রাদুর্ভাব ব্যাপকভাবে থাকলেও সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে ‘এ’ ভিটামিন ক্যাপসুল প্রদান এবং শাকসবজি চাষের প্রচারণার মাধ্যমে অবস্থার কিছুটা উন্নতি হয়েছে। তবুও প্রতি বছর প্রচুর শিশু ‘এ’ ভিটামিনের অভাবজনিত অন্ধত্বের ঝুঁকিতে থাকে। পাশাপাশি আয়োডিনের অভাব দূর করতে আয়োডিনযুক্ত লবণের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। তবে পুষ্টি পরিস্থিতির উন্নতির জন্য মাথাপিছু আয় বৃদ্ধিই একমাত্র সমাধান নয়, বরং এর সাথে উন্নত খাদ্যাভ্যাস, সচেতনতা এবং রোগপ্রবণতা রোধ করাও জরুরি। দেখা গেছে, বার্ষিক মাথাপিছু ১২,০০০ টাকার বেশি আয় করা পরিবারের শিশুদের মধ্যেও ৩০ শতাংশ অপুষ্টিতে আক্রান্ত, যা ইঙ্গিত দেয় যে দারিদ্র্য ছাড়াও পুষ্টিহীনতার পেছনে অজ্ঞতা ও ভুল খাদ্যাভ্যাস বড় ভূমিকা পালন করে।
অন্যদিকে, সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের শহরাঞ্চলে অপুষ্টির বিপরীত মেরু হিসেবে ওজনাধিক্য (overweight) এবং স্থূলতা (obesity) সমস্যা মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। শারীরিক শ্রমের স্বল্পতা এবং জাঙ্ক ফুডের (junk food) মাত্রাতিরিক্ত প্রচলন এর প্রধান কারণ। এই দ্বিমুখী সমস্যা—অর্থাৎ একদিকে অপুষ্টির কারণে শরীর ক্ষয় ও বিকাশহীনতা, অন্যদিকে জাঙ্ক ফুডের প্রভাবে স্থূলতা—বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে এক নতুন সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় একদিকে যেমন পুষ্টি প্রকল্পগুলোর সুষম বাস্তবায়ন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন নাগরিক সচেতনতা। হাঙ্গার প্রজেক্টের মতো সংস্থার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দীর্ঘস্থায়ী বুভুক্ষা নিরসনে শুধু খাদ্য সহায়তা নয়, বরং অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধি ও পুষ্টি সচেতনতামূলক দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার কোনো বিকল্প নেই।