ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট (East Bengal Regiment – EBR) হলো বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পদাতিক বাহিনীর প্রধান এবং প্রাচীনতম রেজিমেন্ট। বাঙালি সৈন্যদের নিয়ে গঠিত এই রেজিমেন্টটি কেবল বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীর মেরুদণ্ডই নয়, বরং এটি বাঙালির শৌর্য, বীরত্ব ও জাতীয়তাবাদের এক অবিচ্ছেদ্য প্রতীক।
ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ইতিহাস, ভূমিকা এবং বিশেষত্বগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:
১. ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর তৎকালীন পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে বাঙালির প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ১৯৪৮ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারি কুষ্টিয়ার মেহেরপুরে প্রথম এই রেজিমেন্ট গঠিত হয়। এর প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন মেজর আব্দুল ওয়াহেদ চৌধুরী। পরবর্তীতে পাকিস্তানি শাসনামলে বাঙালি অফিসার ও সৈন্যদের মেধা ও পেশাদারিত্বে এই রেজিমেন্ট অত্যন্ত শক্তিশালী ও সুশৃঙ্খল বাহিনীতে পরিণত হয়।
২. মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদান
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ভূমিকা ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।
-
সশস্ত্র বিদ্রোহ: ২৫শে মার্চ কালরাত্রিতে পাকিস্তানি বাহিনী যখন ‘অপারেশন সার্চলাইট’ শুরু করে, তখন ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের প্রতিটি ব্যাটালিয়নের বাঙালি অফিসার ও সৈনিকরা বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। তাদের এই তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তই ছিল মুক্তিযুদ্ধের প্রথম এবং প্রধান প্রতিরোধ।
-
সেক্টর ও ফোর্স গঠন: মুক্তিযুদ্ধের সময় সেক্টর কমান্ডারদের বিশাল অংশ এবং ‘জেড ফোর্স’, ‘কে ফোর্স’ ও ‘এস ফোর্স’-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ নিয়মিত বাহিনী এই রেজিমেন্টের অফিসারদের মাধ্যমেই গঠিত হয়েছিল।
-
সম্মুখ সমর: গেরিলা যুদ্ধের পাশাপাশি পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে সম্মুখ সমর বা কনভেনশনাল ওয়্যারফেয়ারে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অবদান সবচেয়ে বেশি ছিল।
৩. রেজিমেন্টের তাৎপর্য ও মর্যাদা
-
বীরত্বের প্রতীক: এই রেজিমেন্টের সদস্যরাই মুক্তিযুদ্ধের সর্বোচ্চ খেতাব ‘বীরশ্রেষ্ঠ’র বেশির ভাগ অর্জন করেছেন। সাতজন বীরশ্রেষ্ঠর মধ্যে পাঁচজনই ছিলেন ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সদস্য।
-
চৌকস প্রশিক্ষণ: রেজিমেন্টের সৈনিকরা অত্যন্ত কঠোর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন, যা তাদের পাহাড়ি যুদ্ধ, নদীমাতৃক এলাকায় অপারেশন এবং আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে পারদর্শী করে তোলে।
-
অখণ্ডতা রক্ষায়: দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত এই রেজিমেন্ট পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তি রক্ষা, সীমান্ত পাহারা এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক শান্তি রক্ষা মিশনে (UN Peacekeeping) অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে আসছে।
৪. প্রতীকী চিহ্ন (Insignia)
ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের প্রতীকে সাধারণত বাঘের (Bengal Tiger) প্রতিকৃতি ব্যবহার করা হয়, যা তাদের রণক্ষেত্রে ক্ষিপ্রতা, সাহস ও শক্তির প্রতীক হিসেবে বিবেচিত।
৫. বর্তমানে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ভূমিকা
বর্তমানে এটি কেবল একটি রেজিমেন্ট নয়, বরং বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রধান শক্তি। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পদাতিক বাহিনীর বেশিরভাগ সদস্যই এই রেজিমেন্টের অন্তর্ভুক্ত। আধুনিক রণকৌশল, ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার এবং আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণে তারা প্রতিনিয়ত নিজেদের সমৃদ্ধ করছে।