জেড ফোর্স

মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনে পরিকল্পিত ও সুসংগঠিত সম্মুখ যুদ্ধ পরিচালনার জন্য ১৯৭১ সালের জুলাই মাসে মুজিবনগর সরকার বাংলাদেশ নিয়মিত বাহিনীর প্রথম ব্রিগেডটি গঠন করে। এই ব্রিগেডের অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পান মেজর জিয়াউর রহমান, এবং তাঁর নামের আদ্যক্ষর ‘Z’ (জেড) অনুসারে এই ফোর্সের নামকরণ করা হয় ‘জেড ফোর্স’। এটি ছিল বাংলাদেশের প্রথম গঠিত নিয়মিত সামরিক ব্রিগেড, যা মুক্তিযুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দিতে এবং পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান তৈরি করতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।

জেড ফোর্স মূলত তিনটি ইনফ্যান্ট্রি রেজিমেন্ট (ব্যাটালিয়ন) এবং এর সহায়ক ইউনিট নিয়ে গঠিত ছিল। ১ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অধিনায়ক ছিলেন মেজর জিয়াউদ্দিন, ৩য় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অধিনায়ক ছিলেন মেজর শাফায়াত জামিল এবং ৮ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অধিনায়ক ছিলেন মেজর আমিনুল হক। এগুলি ছাড়াও জেড ফোর্সে ছিল নিজস্ব আর্টিলারি ব্যাটারি, ইঞ্জিনিয়ার কোম্পানি এবং লজিস্টিক সাপোর্ট ইউনিট।

আরো পড়ুন:  পরাগল-খান

জেড ফোর্সের প্রধান রণক্ষেত্র ছিল বৃহত্তর সিলেট এবং বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চল। এই অঞ্চলের ভৌগোলিক অবস্থান এবং পাকিস্তানি বাহিনীর দুর্গসমূহকে লক্ষ্য করে তারা তাদের সামরিক কৌশল সাজিয়েছিল। জেড ফোর্সের প্রধান লক্ষ্য ছিল পাকিস্তানি বাহিনীর সাপ্লাই চেইন ভেঙে দেওয়া এবং একের পর এক সামরিক ঘাঁটি দখল করে বিজয়ী হওয়া।

জেড ফোর্সের নেতৃত্বে পরিচালিত বেশ কিছু যুদ্ধ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে কিংবদন্তি হয়ে আছে। এর মধ্যে কামালপুর যুদ্ধ ছিল মুক্তিযুদ্ধের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী ও আলোচিত সম্মুখ সমরগুলোর একটি, যেখানে বকশীগঞ্জের কামালপুর দুর্গের পতন ঘটানো ছিল এক কঠিন চ্যালেঞ্জ এবং জেড ফোর্সের যোদ্ধারা অসীম সাহসিকতার সাথে আক্রমণ চালিয়ে এই দুর্গটি দখল করেন। এই যুদ্ধে বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর এবং বীর প্রতীক ক্যাপ্টেন সালাহউদ্দীন মমতাজ অংশগ্রহণ করেছিলেন। শ্রীমঙ্গলের ধলই সীমান্তে পাকিস্তানি বাহিনীর ওপর জেড ফোর্সের আক্রমণ ছিল অত্যন্ত সুপরিকল্পিত এবং সেখানেও তারা ব্যাপক সাফল্য অর্জন করে। যুদ্ধ যখন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায়, তখন জেড ফোর্স একের পর এক এলাকা মুক্ত করে সিলেট শহরের দিকে অগ্রসর হতে থাকে।

আরো পড়ুন:  মুক্তিযুদ্ধ

জেড ফোর্স গঠনের মাধ্যমেই বাংলাদেশ বাহিনীর নিয়মিত ইউনিটগুলো সুসংগঠিত হয় এবং তারা গেরিলা যুদ্ধের পাশাপাশি সম্মুখ যুদ্ধেও পাকিস্তানি বাহিনীকে হারানোর সক্ষমতা অর্জন করে। জেড ফোর্সের প্রতিটি জয় মুক্তিযোদ্ধাদের মনে সাহস জুগিয়েছিল এবং পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর মনোবল ভেঙে দিয়েছিল। এই ফোর্সে যুদ্ধ করা অনেক মুক্তিযোদ্ধা অসামান্য বীরত্বের জন্য বীরশ্রেষ্ঠ, বীর উত্তম, বীর বিক্রম ও বীর প্রতীক খেতাবে ভূষিত হন।

আরো পড়ুন:  মহারাজ প্রাণনারায়ণ

১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসে যখন যুদ্ধ চূড়ান্ত বিজয়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল, তখন জেড ফোর্সের যোদ্ধারা সিলেটের দিকে চূড়ান্ত আক্রমণ চালায়। তাদের চাপের মুখে সিলেট অঞ্চলে পাকিস্তানি বাহিনী দিশেহারা হয়ে পড়েছিল এবং ১৬ই ডিসেম্বর মিত্রবাহিনীর সহায়তায় তারা চূড়ান্ত বিজয় অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। জেড ফোর্স ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতার লড়াইয়ে নিয়মিত বাহিনীর সেই ইস্পাত-কঠিন শক্তি, যারা সাধারণ গেরিলা যুদ্ধকে একটি সুশৃঙ্খল সামরিক অভিযানে রূপান্তরিত করেছিল।