বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ‘অধিনায়ক’ (Commander) শব্দটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। রণাঙ্গনে এই শব্দটি কেবল একটি পদবি ছিল না, এটি ছিল লক্ষ লক্ষ মুক্তিপাগল বাঙালির আশা, সাহস এবং দিকনির্দেশনার প্রতীক। মুক্তিযুদ্ধে অধিনায়কত্বের স্তরবিন্যাস ও তাঁদের ভূমিকা বেশ কয়েকটি ধাপে বিভক্ত ছিল।
মুক্তিযুদ্ধের সামগ্রিক রণকৌশল প্রণয়ন ও মাঠপর্যায়ে যুদ্ধ পরিচালনার জন্য সমগ্র বাংলাদেশকে ১১টি সেক্টরে ভাগ করা হয়, যেখানে প্রতিটি সেক্টরের নেতৃত্বে ছিলেন একজন সেক্টর কমান্ডার। সেক্টরের সীমানার ভেতরে গেরিলাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া, অস্ত্র ও গোলাবারুদ সরবরাহ নিশ্চিত করা, অপারেশন পরিচালনা করা এবং প্রশাসনিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা ছিল তাঁদের অন্যতম দায়িত্ব। তাঁরা ছিলেন মুজিবনগর সরকারের সামরিক প্রতিনিধি এবং তাঁদের নির্দেশেই পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ যুদ্ধ থেকে শুরু করে চূড়ান্ত বিজয়ের লড়াই পরিচালিত হয়েছে।
যুদ্ধের গতি ও তীব্রতা বাড়ানোর জন্য নিয়মিত বাহিনীর সমন্বয়ে তিনটি শক্তিশালী ব্রিগেড বা ‘ফোর্স’ গঠিত হয়। এই ফোর্সগুলোর অধিনায়ক বা কমান্ডারদের ভূমিকা ছিল সম্মুখ সমরে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জেড ফোর্সের (Z-Force) অধিনায়ক ছিলেন মেজর জিয়াউর রহমান, কে ফোর্সের (K-Force) অধিনায়ক ছিলেন মেজর খালেদ মোশাররফ এবং এস ফোর্সের (S-Force) অধিনায়ক ছিলেন মেজর কে. এম. শফিউল্লাহ। এই ফোর্স কমান্ডাররা সরাসরি পাকিস্তানি বাহিনীর শক্তিশালী অবস্থানের ওপর ভারী অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে আক্রমণ পরিচালনা করতেন, যা যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দিতে ব্যাপকভাবে সহায়ক ছিল।
প্রতিটি সেক্টরের অধীনে বেশ কিছু সাব-সেক্টর ছিল এবং সাব-সেক্টরের অধিনায়করা ছিলেন সরাসরি মাঠপর্যায়ের যুদ্ধের প্রাণ। তাঁরাই মূলত সাধারণ ছাত্র, কৃষক ও যুবকদের গেরিলা যুদ্ধের হাতেখড়ি দিতেন। ঢাকা শহরের ‘ক্র্যাক প্লাটুন’ এর মতো বিশেষ গেরিলা ইউনিটের অধিনায়করা সরাসরি শত্রুঘাঁটিতে বা শহরের ভেতরে অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে অপারেশন পরিচালনা করতেন।
মুক্তিযুদ্ধের অধিনায়কদের নেতৃত্বের কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল যা তাঁদের অপ্রতিদ্বন্দ্বী করে তুলেছিল। তাঁরা কেবল আদেশ দিতেন না, বরং নিজেরা যুদ্ধের সম্মুখভাগে থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের সাহস জোগাতেন, যা ছিল তাঁদের মনস্তাত্ত্বিক নেতৃত্বের বড় প্রমাণ। যুদ্ধের শুরুতে গেরিলা কৌশল এবং শেষে মিত্রবাহিনীর সাথে সমন্বয় করে সম্মুখ সমরের যে রূপান্তর, তা তাঁদের দূরদর্শী কৌশলগত দক্ষতার পরিচয় বহন করে। সর্বোপরি, অস্ত্রহীন একদল তরুণকে একটি সুশৃঙ্খল বাহিনীতে পরিণত করার অসম্ভব কাজটি এই অসাধারণ সংগঠকরাই করেছিলেন।