জিয়াউর রহমান

বাংলাদেশের ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে জিয়াউর রহমান একটি অবিচ্ছেদ্য নাম। তিনি কেবল একজন সামরিক কর্মকর্তা ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের এক অনন্য সংগঠক, বীর মুক্তিযোদ্ধা, ‘জেড ফোর্সের’ প্রতিষ্ঠাতা অধিনায়ক এবং পরবর্তীকালে আধুনিক বাংলাদেশের অন্যতম রূপকার ও সপ্তম রাষ্ট্রপতি। তাঁর জীবনের প্রতিটি মোড় বাংলাদেশের ইতিহাসের এক একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সাথে গভীরভাবে জড়িত।

জন্ম ও প্রারম্ভিক জীবন

জিয়াউর রহমান ১৯৩৬ সালের ১৯ জানুয়ারি বগুড়া জেলার বাগবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা মনসুর রহমান ছিলেন একজন সরকারি রসায়নবিদ। জিয়ার শৈশব ও কৈশোর কেটেছে কলকাতা, অবিভক্ত বাংলার বিভিন্ন অঞ্চল এবং পরবর্তীতে পশ্চিম পাকিস্তানে। শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী, শান্ত এবং শৃঙ্খলাপরায়ণ। ১৯৫৩ সালে তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে অফিসার ক্যাডেট হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৫৫ সালে তিনি কমিশন লাভ করেন এবং একজন পেশাদার সামরিক কর্মকর্তা হিসেবে নিজের কর্মজীবন শুরু করেন।

১৯৭১ সালের মার্চ: ইতিহাসের ডাক

১৯৭১ সালের মার্চ মাসে জিয়াউর রহমান অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড হিসেবে চট্টগ্রামে দায়িত্ব পালন করছিলেন। তৎকালীন রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং পাকিস্তানি শাসকদের বৈষম্যমূলক আচরণের কারণে বাঙালিদের মধ্যে ক্ষোভ তখন তুঙ্গে। ২৫শে মার্চ অপারেশন সার্চলাইটের মাধ্যমে পাকিস্তানি বাহিনী গণহত্যা শুরু করলে জিয়াউর রহমান আর দ্বিধা করেননি।

ইতিহাসের সেই ক্রান্তিলগ্নে তিনি পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর প্রতি আনুগত্য ত্যাগ করেন। চট্টগ্রামে তিনি রেজিমেন্টের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করেন। এটি ছিল মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের প্রথম দিকের সশস্ত্র বিদ্রোহের অন্যতম সাহসী ঘটনা। ২৭শে মার্চ চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে তিনি বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করেন। তাঁর কণ্ঠে এই ঘোষণার বার্তা বাংলাদেশের মানুষের মাঝে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে এবং প্রতিরোধ যুদ্ধের প্রেরণা জোগায়।

রণাঙ্গনে জিয়াউর রহমান: সেক্টর কমান্ডার ও জেড ফোর্সের অধিনায়ক

মুক্তিযুদ্ধকে সুসংগঠিত করার লক্ষ্যে যখন বাংলাদেশকে ১১টি সেক্টরে ভাগ করা হয়, তখন জিয়াউর রহমানকে ১নং সেক্টরের অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও নোয়াখালীর দুর্গম এলাকায় তিনি পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ব্যুহ গড়ে তোলেন।

তবে তাঁর সবচেয়ে বড় সামরিক অবদান হলো ‘জেড ফোর্স’ গঠন। জুলাই মাসে নিয়মিত বাহিনীকে সুসংগঠিত করে তিনটি ব্রিগেড গঠিত হয়। এর মধ্যে প্রথম ব্রিগেডটি ছিল তাঁর নামে আদ্যক্ষর ‘Z’ বা ‘জেড ফোর্স’। তাঁর নেতৃত্বে জেড ফোর্সের মুক্তিযোদ্ধারা সম্মুখ সমরে অকল্পনীয় সাহসিকতা প্রদর্শন করেন। বিশেষ করে ময়মনসিংহ ও সিলেট সীমান্তে অবস্থিত কামালপুর দুর্গের পতন ছিল তাঁর নেতৃত্বে পরিচালিত অন্যতম সেরা সামরিক অপারেশন। এই যুদ্ধে তিনি নিজে রণক্ষেত্রে উপস্থিত থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের সাহস জুগিয়েছিলেন, যা পাকিস্তানি বাহিনীর মনোবল ভেঙে দিয়েছিল। মহান মুক্তিযুদ্ধে তাঁর বীরত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার তাঁকে ‘বীর উত্তম’ খেতাবে ভূষিত করে।

যুদ্ধোত্তর সামরিক জীবন

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর জিয়াউর রহমান সেনাবাহিনীতে পুনরায় যোগ দেন। ১৯৭২ সালে তিনি ডেপুটি চিফ অব আর্মি স্টাফ এবং পরবর্তীতে ১৯৭৩ সালে মেজর জেনারেল পদে উন্নীত হন। ১৯৭৫ সালে তিনি সেনাবাহিনীর চিফ অব আর্মি স্টাফ হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তবে ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টের রক্তাক্ত ঘটনা এবং পরবর্তী সামরিক অভ্যুত্থানের নাটকীয়তায় বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামরিক পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন ঘটে। ৭ই নভেম্বর সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থান জিয়াউর রহমানকে বাংলাদেশের ক্ষমতার কেন্দ্রে নিয়ে আসে।

রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান: আধুনিক বাংলাদেশের রূপকার

১৯৭৭ সালে জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর শাসনামলে বাংলাদেশ রাষ্ট্র পুনর্গঠনের একটি নতুন ধারায় প্রবেশ করে। তাঁর উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপগুলোর মধ্যে ছিল:

  1. বহুদলীয় গণতন্ত্র: তিনি দেশে একদলীয় শাসনের পরিবর্তে বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রবর্তন করেন এবং ‘বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল’ (বিএনপি) প্রতিষ্ঠা করেন।
  2. অর্থনৈতিক নীতিমালা: জিয়াউর রহমান সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির পরিবর্তে উন্মুক্ত বাজার অর্থনীতির সূচনা করেন। তিনি কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য সেচ প্রকল্প, খাল খনন কর্মসূচি এবং শিল্পায়নে বেসরকারি খাতকে উৎসাহিত করেন।
  3. পররাষ্ট্রনীতি: তাঁর দূরদর্শী পররাষ্ট্রনীতির কারণে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এক নতুন পরিচিতি লাভ করে। বিশেষ করে ‘সার্ক’ (SAARC) গঠনের মূল ধারণাটি ছিল তাঁরই। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতার যে প্ল্যাটফর্ম আজ আমরা দেখি, তার ভিত্তিপ্রস্তর ছিল জিয়াউর রহমানের কূটনৈতিক দূরদর্শিতা।
  4. ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয়: তিনি বাংলাদেশের সংবিধানে মহান আল্লাহর ওপর আস্থা ও বিশ্বাসের প্রতিফলন ঘটান এবং সংবিধানে ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’—এর মূলনীতি যুক্ত করেন, যা বাঙালি জাতির পরিচিতিকে আরও সুসংহত করে।

নেতৃত্বের বৈশিষ্ট্য ও জনপ্রিয়তা

জিয়াউর রহমান ছিলেন একজন কঠোর পরিশ্রমী এবং শৃঙ্খলাপরায়ণ মানুষ। রাষ্ট্রপতি থাকা অবস্থায় তিনি দেশের গ্রাম-গঞ্জ ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে সফর করতেন। সাধারণ মানুষের সাথে তাঁর সরাসরি যোগাযোগ ছিল অত্যন্ত গভীর। তাঁর ‘আপনার খাল নিজে কাটুন’—এই শ্লোগানটি সাধারণ মানুষের মাঝে ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল। তিনি বিশ্বাস করতেন, স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ার পথ হলো গ্রাম-কেন্দ্রিক উন্নয়ন।

মর্মান্তিক পরিণতি ও legacy

১৯৮১ সালের ৩০শে মে চট্টগ্রামে একটি ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানে তিনি নির্মমভাবে নিহত হন। তাঁর মৃত্যুতে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক বিরাট শূন্যতা সৃষ্টি হয়। তাঁর মৃত্যু সংবাদ সারা দেশে শোকের ছায়া নামিয়ে আনে।