উন্মুক্ত বাজার অর্থনীতি (Open Market Economy) হলো এমন একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, যেখানে সরকারি হস্তক্ষেপ সর্বনিম্ন পর্যায়ে থাকে এবং পণ্যের দাম, উৎপাদন ও বণ্টন মূলত অবাধ প্রতিযোগিতা এবং বাজার চাহিদার (সরবরাহ ও চাহিদা) ওপর নির্ভর করে নির্ধারিত হয়। একে ‘মুক্ত বাজার অর্থনীতি’ বা ‘ফ্রি মার্কেট ইকোনমি’ও বলা হয়।
নিচে উন্মুক্ত বাজার অর্থনীতি সম্পর্কে একটি এনসাইক্লোপিডিয়া পোস্ট দেওয়া হলো:
উন্মুক্ত বাজার অর্থনীতি: সমৃদ্ধি ও প্রতিযোগিতার পথ
উন্মুক্ত বাজার অর্থনীতি হলো আধুনিক অর্থনীতির এমন একটি মডেল, যেখানে ক্রেতা এবং বিক্রেতা একে অপরের সাথে অবাধে লেনদেন করতে পারে। এই ব্যবস্থায় অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তগুলো সাধারণত কেন্দ্রীয় কোনো নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের নির্দেশে নয়, বরং ব্যক্তিগত উদ্যোগ এবং বাজারের শক্তির (Market Forces) মাধ্যমে পরিচালিত হয়।
মূল বৈশিষ্ট্যসমূহ
১. অবাধ প্রতিযোগিতা: বাজারে পণ্য বা সেবার দাম নির্ধারণে কোনো একক সংস্থা বা সরকারের নিয়ন্ত্রণ থাকে না। অসংখ্য বিক্রেতা থাকায় ক্রেতারা প্রতিযোগিতামূলক দামে সেরা পণ্যটি বেছে নিতে পারে। ২. বেসরকারি মালিকানা: উৎপাদনের উপকরণসমূহ (ভূমি, মূলধন, যন্ত্রপাতি) ব্যক্তিগত মালিকানায় থাকে। ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান নিজস্ব সিদ্ধান্তে ব্যবসা পরিচালনা করতে পারে। ৩. সরবরাহ ও চাহিদা (Supply and Demand): বাজারে কোনো পণ্যের চাহিদা বেশি এবং সরবরাহ কম হলে তার দাম বাড়ে। আবার সরবরাহ বেশি এবং চাহিদা কম হলে দাম কমে। এই স্বয়ংক্রিয় প্রক্রিয়াই দাম নিয়ন্ত্রণ করে। ৪. সীমিত সরকারি হস্তক্ষেপ: সরকারের ভূমিকা এখানে মূলত আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা করা, চুক্তি বাস্তবায়ন করা এবং একচেটিয়া কারবার (Monopoly) রোধ করার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে।
ইতিহাস ও প্রেক্ষাপট
অষ্টাদশ শতাব্দীতে বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ অ্যাডাম স্মিথ তাঁর ‘দ্য ওয়েলথ অব নেশনস’ গ্রন্থে এই ধারণার ভিত্তি স্থাপন করেন। তিনি একে ‘অদৃশ্য হাত’ (Invisible Hand) হিসেবে অভিহিত করেছিলেন, যা বাজারকে ভারসাম্যপূর্ণ রাখে। পরবর্তীতে ২০তম শতাব্দীতে বিশ্বব্যাপী বিশ্বায়ন (Globalization) এবং বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (WTO) প্রভাবে অধিকাংশ দেশ উন্মুক্ত বাজার অর্থনীতি গ্রহণ করে।
সুবিধা ও গুরুত্ব
-
দ্রুত প্রবৃদ্ধি: প্রতিযোগিতার ফলে উদ্ভাবন বাড়ে এবং পণ্যের মান উন্নত হয়।
-
ভোক্তার সুবিধা: ভোক্তারা সুলভ মূল্যে বৈচিত্র্যময় পণ্য পাওয়ার সুযোগ পায়।
-
দক্ষতা বৃদ্ধি: যেহেতু টিকে থাকার জন্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে দক্ষ হতে হয়, তাই সম্পদের অপচয় কমে এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পায়।
চ্যালেঞ্জ ও সীমাবদ্ধতা
যদিও এই অর্থনীতি প্রবৃদ্ধির জন্য কার্যকর, এর কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে:
-
বৈষম্য: অবাধ প্রতিযোগিতায় ধনীরা আরও ধনী হতে পারে, ফলে সমাজে আয়ের বৈষম্য বাড়তে পারে।
-
বাজার ব্যর্থতা: কিছু ক্ষেত্রে বাজার নিজেই ভারসাম্য রক্ষা করতে পারে না (যেমন: পরিবেশ দূষণ বা পাবলিক সার্ভিস)।
-
একচেটিয়া ব্যবসার ঝুঁকি: বড় বড় কোম্পানি অনেক সময় ছোট প্রতিযোগীদের বাজার থেকে সরিয়ে দিয়ে পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে উন্মুক্ত বাজার অর্থনীতি
বাংলাদেশ আশির দশকের শেষভাগ থেকে এবং বিশেষ করে নব্বইয়ের দশকের শুরুতে উন্মুক্ত বাজার অর্থনীতির পথ অবলম্বন করে। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর বেসরকারিকরণ, শুল্ক হার হ্রাস এবং বিদেশি বিনিয়োগকে উৎসাহিত করার মাধ্যমে বাংলাদেশ এই ব্যবস্থায় প্রবেশ করে। বিএনপি সরকারের বিভিন্ন শাসনামলে শিল্পায়ন ও বৈদেশিক বিনিয়োগ বৃদ্ধির লক্ষ্যে উন্মুক্ত বাজার নীতিকে আরও জোরালোভাবে কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়, যা বাংলাদেশের রপ্তানিমুখী অর্থনীতিকে আজকের পর্যায়ে নিয়ে এসেছে।