অপটিক্যাল ফাইবার (Optical Fibre) বা আলোকতন্তু হলো কাচ (সিলিকা) অথবা বিশেষ ধরনের প্লাস্টিকের তৈরি অত্যন্ত সূক্ষ্ম, নমনীয় এবং স্বচ্ছ একটি তন্তু, যার মধ্য দিয়ে আলোর পূর্ণ অভ্যন্তরীণ প্রতিফলনের (Total Internal Reflection) ধর্মকে কাজে লাগিয়ে তথ্য (Data), শব্দ (Voice) বা প্রতিবিম্ব (Image) এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে আলোর বেগে প্রেরণ করা হয়। মানুষের মাথার চুলের চেয়েও সূক্ষ্ম এই তন্তু আধুনিক টেলিযোগাযোগ এবং তথ্যপ্রযুক্তির জগতে এক যুগান্তকারী বিপ্লব সাধন করেছে। সহজভাবে বলতে গেলে, অপটিক্যাল ফাইবার হলো আলোর এক ধরনের পরিবাহক। তামার তারের মধ্য দিয়ে যেখানে বৈদ্যুতিক সংকেত বা ইলেকট্রন প্রবাহিত হয়, সেখানে অপটিক্যাল ফাইবারের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয় ফোটন বা আলোক কণা। এর সাহায্যে বিপুল পরিমাণ তথ্য কোনো রকম বিকৃতি বা শক্তির অপচয় ছাড়াই পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে মুহূর্তের মধ্যে পাঠানো সম্ভব। বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে ‘গ্লোবাল ইনফরমেশন সুপার হাইওয়ে’ (Global Information Superhighway)-এর মূল মেরুদণ্ডই হলো এই অপটিক্যাল ফাইবার নেটওয়ার্ক। [উৎস: বাংলাপিডিয়া – বাংলাদেশ জাতীয় জ্ঞানকোষ]
বিজ্ঞানের মূলনীতি (Scientific Principle)
অপটিক্যাল ফাইবারের কার্যপ্রণালী সম্পূর্ণরূপে পদার্থবিজ্ঞানের আলোকবিজ্ঞান (Optics) শাখার ওপর নির্ভরশীল। এর মূল ভিত্তি হলো ‘পূর্ণ অভ্যন্তরীণ প্রতিফলন’ (Total Internal Reflection)। আমরা জানি, আলো যখন ঘন মাধ্যম থেকে হালকা মাধ্যমে প্রবেশ করে, তখন তা অভিলম্ব থেকে দূরে সরে যায়। আপতন কোণের মান ক্রমান্বয়ে বাড়াতে থাকলে প্রতিসরণ কোণের মানও বাড়তে থাকে। আপতন কোণের যে নির্দিষ্ট মানের জন্য প্রতিসরণ কোণের মান ৯০ ডিগ্রি হয় (অর্থাৎ প্রতিসরিত রশ্মি দুই মাধ্যমের বিভেদতল ঘেঁষে চলে যায়), তাকে ওই দুই মাধ্যমের ‘সংকট কোণ’ (Critical Angle) বলা হয়। এখন, আলো যদি ঘন মাধ্যম থেকে হালকা মাধ্যমে সংকট কোণের চেয়েও বড় কোণে আপতিত হয়, তবে আলো আর প্রতিসরিত হয়ে হালকা মাধ্যমে প্রবেশ করতে পারে না; বরং দুই মাধ্যমের বিভেদতলে প্রতিফলিত হয়ে সম্পূর্ণ আলো আবার ঘন মাধ্যমেই ফিরে আসে। এই ঘটনাকেই আলোর পূর্ণ অভ্যন্তরীণ প্রতিফলন বলে।
অপটিক্যাল ফাইবারের ক্ষেত্রে, ভেতরের অংশ বা ‘কোর’ (Core) ঘন মাধ্যম হিসেবে কাজ করে, যার প্রতিসরাঙ্ক (Refractive index) তুলনামূলকভাবে বেশি থাকে। আর এর বাইরের আবরণ বা ‘ক্ল্যাডিং’ (Cladding) হালকা মাধ্যম হিসেবে কাজ করে, যার প্রতিসরাঙ্ক কোরের চেয়ে কম থাকে। যখন কোনো আলোক রশ্মি ফাইবারের এক প্রান্তে একটি নির্দিষ্ট কোণে প্রবেশ করানো হয়, তখন তা কোর এবং ক্ল্যাডিংয়ের বিভেদতলে সংকট কোণের চেয়ে বড় কোণে আপতিত হয়। ফলে আলোর পূর্ণ অভ্যন্তরীণ প্রতিফলন ঘটে এবং আলো ফাইবারের ভেতর দিয়ে জিগজ্যাগ (Zig-zag) পথে অগ্রসর হতে থাকে। যেহেতু এখানে আলোর কোনো প্রতিসরণ বা শোষণ প্রায় হয়ই না, তাই আলোর তীব্রতা বা শক্তির কোনো অপচয় ছাড়াই সংকেত হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে পৌঁছে যেতে পারে। [উৎস: পদার্থবিজ্ঞান দ্বিতীয় পত্র – উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাবোর্ড]
অপটিক্যাল ফাইবারের গঠনকাঠামো (Structure of Optical Fiber)
একটি আদর্শ অপটিক্যাল ফাইবার মূলত তিনটি প্রধান অংশ নিয়ে গঠিত হয়:
১. কোর (Core): এটি অপটিক্যাল ফাইবারের একেবারে কেন্দ্রস্থ অংশ। কোর মূলত অত্যন্ত উচ্চমানের সিলিকা কাচ (Silica glass) বা ক্ষেত্রবিশেষে প্লাস্টিক দিয়ে তৈরি হয়। এর মধ্য দিয়েই আলো চলাচল করে। কোরের ব্যাস ফাইবারের ধরনের ওপর ভিত্তি করে ৮ মাইক্রোমিটার থেকে ১০০ মাইক্রোমিটার পর্যন্ত হতে পারে (১ মাইক্রোমিটার = ১ মিটারের ১০ লক্ষ ভাগের ১ ভাগ)। কোরের প্রতিসরাঙ্ক বাইরের আবরণের চেয়ে বেশি থাকে।
২. ক্ল্যাডিং (Cladding): কোরের ঠিক চারপাশ ঘিরে থাকা কাচ বা প্লাস্টিকের আবরণটিকে ক্ল্যাডিং বলা হয়। এর প্রধান কাজ হলো কোর থেকে আলোকে বাইরে বেরিয়ে যেতে না দেওয়া এবং পূর্ণ অভ্যন্তরীণ প্রতিফলনে সাহায্য করা। ক্ল্যাডিংয়ের প্রতিসরাঙ্ক সর্বদা কোরের প্রতিসরাঙ্কের চেয়ে কম হয়। ক্ল্যাডিংয়ের ব্যাস সাধারণত ১২৫ মাইক্রোমিটার হয়ে থাকে। কোর ও ক্ল্যাডিং মিলেই মূলত অপটিক্যাল ফাইবারের মূল অপটিক্যাল অংশ গঠন করে।
৩. কোটিং বা বাফার (Coating/Buffer): কোর এবং ক্ল্যাডিং অত্যন্ত ভঙ্গুর কাচ দিয়ে তৈরি হওয়ায় এদের বাইরের আঘাত, আর্দ্রতা এবং বাঁকানো জনিত ক্ষতি থেকে রক্ষা করার জন্য এর ওপর প্লাস্টিকের একটি প্রলেপ দেওয়া হয়, যাকে বাফার বা কোটিং বলা হয়। এটি সাধারণত ২৫০ মাইক্রোমিটার পুরু হয়।
এছাড়াও কেবল হিসেবে ব্যবহারের সময় এর ওপর ‘স্ট্রেন্থ মেম্বার’ (Strength member) হিসেবে কেভলার (Kevlar) সুতা এবং সর্ববহিঃস্থ আবরণ হিসেবে পলিইউরেথিন বা পিভিসি (PVC) এর তৈরি আউটার জ্যাকেট (Outer Jacket) ব্যবহার করা হয়, যা ফাইবারকে চরম প্রতিকূল পরিবেশেও টিকে থাকতে সাহায্য করে। [উৎস: অপটিক্যাল ফাইবার কমিউনিকেশনস – জন এম. সিনিয়র]
অপটিক্যাল ফাইবারের প্রকারভেদ (Classification of Optical Fibers) আলো চলাচলের পথ বা মোড (Mode) এবং কোরের প্রতিসরাঙ্কের (Refractive Index) প্রকৃতির ওপর ভিত্তি করে অপটিক্যাল ফাইবারকে মূলত তিন ভাগে ভাগ করা যায়:
- ১. স্টেপ-ইনডেক্স মাল্টিমোড ফাইবার (Step-Index Multimode Fiber): এই ফাইবারের কোরের ব্যাস অপেক্ষাকৃত বড় (প্রায় ৫০-১০০ মাইক্রোমিটার) হয়। এর কোরের সর্বত্র প্রতিসরাঙ্ক সমান থাকে এবং ক্ল্যাডিংয়ে ধাপে ধাপে (Step) প্রতিসরাঙ্ক কমে যায়। যেহেতু কোরের ব্যাস বড়, তাই এর মধ্য দিয়ে একই সাথে আলোর অসংখ্য মোড বা রশ্মি বিভিন্ন পথে প্রবেশ করতে পারে। তবে বিভিন্ন পথে চলাচলের কারণে আলো একই সময়ে অপর প্রান্তে পৌঁছাতে পারে না, ফলে সিগন্যাল কিছুটা ছড়িয়ে পড়ে (যাকে মোডাল ডিসপারশন বলে)। এটি মূলত স্বল্প দূরত্বের লোকাল এরিয়া নেটওয়ার্ক (LAN)-এ ব্যবহৃত হয়।
- ২. গ্রেডেড-ইনডেক্স মাল্টিমোড ফাইবার (Graded-Index Multimode Fiber): এই ফাইবারে কোরের প্রতিসরাঙ্ক সর্বত্র সমান থাকে না। কেন্দ্রবিন্দুতে প্রতিসরাঙ্ক সবচেয়ে বেশি থাকে এবং কেন্দ্র থেকে বাইরের দিকে ক্ল্যাডিংয়ের কাছাকাছি যেতে যেতে প্রতিসরাঙ্ক ক্রমশ (Gradually) কমতে থাকে। এর ফলে আলো ফাইবারের ভেতর দিয়ে অনেকটা সাইন কার্ভ বা ঢেউয়ের মতো পথে অগ্রসর হয়। এতে মোডাল ডিসপারশন অনেক কম হয় এবং সিগন্যাল অনেক দূর পর্যন্ত নিখুঁতভাবে পৌঁছাতে পারে। এটি মাঝারি দূরত্বের যোগাযোগের জন্য আদর্শ।
- ৩. সিঙ্গেল-মোড ফাইবার (Single-Mode Fiber): আধুনিক টেলিযোগাযোগ এবং সাবমেরিন ক্যাবলে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় সিঙ্গেল-মোড ফাইবার। এর কোরের ব্যাস অত্যন্ত সূক্ষ্ম (মাত্র ৮ থেকে ১০ মাইক্রোমিটার)। কোর এতই সরু যে এর মধ্য দিয়ে আলোর কেবল একটিমাত্র মোড বা রশ্মি (সরাসরি সরলরেখায়) চলাচল করতে পারে। এতে কোনো মোডাল ডিসপারশন হয় না বললেই চলে। ফলস্বরূপ, সিঙ্গেল-মোড ফাইবার ব্যবহার করে সর্বোচ্চ ব্যান্ডউইথ (Bandwidth) পাওয়া যায় এবং কোনো রিপিটার (Repeater) ছাড়াই শত শত কিলোমিটার দূরে তথ্য পাঠানো সম্ভব হয়। এর কোর অত্যন্ত সরু হওয়ায় এতে আলো প্রবেশ করানো (Splicing) বেশ কঠিন এবং এর জন্য উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন লেজার (Laser) রশ্মির প্রয়োজন হয়। [উৎস: ফাইবার অপটিক কমিউনিকেশন টেকনোলজি – জ্যাফারফ]
ইতিহাস ও বিবর্তন (History and Evolution) আলোর সাহায্যে যোগাযোগের ধারণাটি খুব নতুন নয়। ১৮৪০-এর দশকে ফরাসি বিজ্ঞানী ড্যানিয়েল কোলাডন (Daniel Colladon) এবং জ্যাক বাবিলেট (Jacques Babinet) প্রথম প্রদর্শন করেন যে পানির স্রোতের ভেতরে আলোকে আবদ্ধ করে বাঁকানো পথে নিয়ে যাওয়া সম্ভব। ১৮৫৪ সালে আইরিশ বিজ্ঞানী জন টিন্ডাল (John Tyndall) লন্ডনের রয়্যাল সোসাইটিতে একটি পরীক্ষার মাধ্যমে প্রমাণ করেন যে একটি পাত্রের ছিদ্র দিয়ে পড়া পানির বক্র স্রোতের মধ্য দিয়ে আলো পূর্ণ অভ্যন্তরীণ প্রতিফলনের মাধ্যমে প্রবাহিত হতে পারে। এটিই ছিল অপটিক্যাল ফাইবারের আদিমতম বৈজ্ঞানিক ভিত্তি।
বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে চিকিৎসা বিজ্ঞানে, বিশেষ করে দাঁত ও পেটের ভেতরের ছবি দেখার জন্য কাচের তন্তুর ব্যবহার শুরু হয়। কিন্তু সেই সময়ের কাচ এতই অশুদ্ধ ছিল যে, কয়েক মিটার যেতে না যেতেই আলোর বেশিরভাগ অংশ শোষিত হয়ে যেত (যাকে Attenuation বলে)। অপটিক্যাল ফাইবারের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় যুগান্তকারী আবিষ্কারটি আসে ১৯৬৬ সালে। সেই বছর চীনা বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ বিজ্ঞানী চার্লস কে. কাও (Charles K. Kao) এবং জর্জ হেক্যাম (George Hockham) একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন। চার্লস কাও প্রমাণ করেন যে কাচের ভেতরের অপদ্রব্য (Impurities) দূর করে যদি ১০০% বিশুদ্ধ সিলিকা কাচ তৈরি করা যায়, তবে অপটিক্যাল ফাইবারের মধ্য দিয়ে আলোর ক্ষয় (Attenuation) প্রতি কিলোমিটারে ২০ ডেসিবেলের (dB/km) নিচে নামিয়ে আনা সম্ভব, যা দূরপাল্লার টেলিযোগাযোগের জন্য উপযুক্ত। এই যুগান্তকারী ধারণার জন্য চার্লস কে. কাও-কে ‘ফাইবার অপটিক্সের জনক’ বলা হয় এবং তিনি ২০০৯ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন।
কাও-এর এই তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে ১৯৭০ সালে আমেরিকার কর্নিং গ্লাস ওয়ার্কস (Corning Glass Works)-এর তিন বিজ্ঞানী—রবার্ট মাউয়ার, ডোনাল্ড কেক এবং পিটার শুলজ—প্রথমবারের মতো সফলভাবে এমন একটি অপটিক্যাল ফাইবার তৈরি করেন, যার আলোর ক্ষয় ছিল প্রতি কিলোমিটারে মাত্র ১৭ ডেসিবেল। তারা সিলিকা কাচের সাথে টাইটানিয়াম মিশিয়ে (Doping) এই অসামান্য সাফল্য অর্জন করেন। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। ১৯৭৭ সালে আমেরিকার শিকাগো শহরে জিটিই (GTE) এবং এটিঅ্যান্ডটি (AT&T) কোম্পানি প্রথমবারের মতো অপটিক্যাল ফাইবার ব্যবহার করে বাণিজ্যিক টেলিফোন যোগাযোগ ব্যবস্থা স্থাপন করে। আশির দশকে সমুদ্রের তলদেশ দিয়ে সাবমেরিন ক্যাবল স্থাপনের মাধ্যমে আন্তঃমহাদেশীয় টেলিযোগাযোগে এক নতুন যুগের সূচনা হয়। [উৎস: আধুনিক টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি ইতিহাস]
যোগাযোগ ব্যবস্থায় কার্যপ্রণালী (How it works in Telecommunication)
টেলিফোন বা ইন্টারনেটের তামার তারকে প্রতিস্থাপন করে অপটিক্যাল ফাইবার কীভাবে কাজ করে, তা একটি চমৎকার প্রক্রিয়া। প্রথমে কম্পিউটার বা টেলিফোন থেকে আসা ডিজিটাল বৈদ্যুতিক সংকেতগুলোকে (Electrical signals) একটি অপটিক্যাল ট্রান্সমিটারে (Optical Transmitter) পাঠানো হয়। ট্রান্সমিটারে থাকা লেজার ডায়োড (Laser Diode) বা এলইডি (LED) ওই বৈদ্যুতিক সংকেতগুলোকে দ্রুত স্পন্দিত আলোক তরঙ্গে (Light pulses) রূপান্তরিত করে (০ এবং ১ এর ডিজিটাল সংকেত হিসেবে)। এরপর এই আলোক তরঙ্গগুলো অপটিক্যাল ফাইবারের কোরের মধ্য দিয়ে পূর্ণ অভ্যন্তরীণ প্রতিফলনের মাধ্যমে গন্তব্যের দিকে ছুটে চলে। গন্তব্যে পৌঁছানোর পর অপটিক্যাল রিসিভার (Optical Receiver)-এ থাকা ফটোডায়োড (Photodiode) বা আলোক সংবেদী সেন্সর সেই আলোক তরঙ্গগুলোকে পুনরায় বৈদ্যুতিক সংকেতে রূপান্তরিত করে, যা কম্পিউটার বা রাউটার বুঝতে পারে। বর্তমানে ‘ওয়েভলেংথ ডিভিশন মাল্টিপ্লেক্সিং’ বা ডব্লিউডিএম (WDM – Wavelength Division Multiplexing) প্রযুক্তির মাধ্যমে একটি মাত্র ফাইবারের ভেতর দিয়ে আলোর বিভিন্ন রঙ বা তরঙ্গদৈর্ঘ্য ব্যবহার করে একই সাথে অসংখ্য চ্যানেলের ডেটা আদান-প্রদান করা সম্ভব হচ্ছে। [উৎস: ডেটা কমিউনিকেশনস অ্যান্ড নেটওয়ার্কিং – ফরোজান]
সুবিধা ও গুণাগুণ (Advantages of Optical Fiber)
প্রচলিত তামার তার (Copper Cable) বা কো-অ্যাক্সিয়াল ক্যাবলের তুলনায় অপটিক্যাল ফাইবারের সুবিধাগুলো এতটাই বৈপ্লবিক যে, বর্তমান বিশ্বে এর কোনো বিকল্প নেই।
- ১. বিপুল ব্যান্ডউইথ (High Bandwidth): অপটিক্যাল ফাইবার আলোক তরঙ্গ ব্যবহার করে, যার কম্পাঙ্ক (Frequency) রেডিও বা মাইক্রোওয়েভের চেয়ে বহুগুণ বেশি। ফলে একটি মাত্র সরু ফাইবার দিয়ে একই সময়ে কয়েক লক্ষ টেলিফোন কল বা কয়েক টেরাবাইট (Terabytes) ইন্টারনেট ডেটা আদান-প্রদান করা সম্ভব।
- ২. সংকেতের কম ক্ষয় (Low Attenuation): তামার তারে বিদ্যুৎ প্রবাহের সময় রোধের (Resistance) কারণে প্রচুর শক্তি ক্ষয় হয়। কিন্তু বিশুদ্ধ সিলিকা ফাইবারে আলোর ক্ষয় অত্যন্ত নগণ্য (প্রতি কিলোমিটারে প্রায় সাত শতাংশ বা ০.২ dB)। ফলে কোনো বুস্টার বা রিপিটার ছাড়াই ১০০ কিলোমিটারের বেশি দূরত্বে সিগন্যাল পাঠানো যায়।
- ৩. ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক ইন্টারফারেন্স মুক্ত (Immunity to EMI): তামার তারের পাশ দিয়ে উচ্চ ভোল্টেজের বিদ্যুতের লাইন গেলে তড়িৎচৌম্বকীয় ব্যতিচার বা ইএমআই (EMI)-এর কারণে ডেটা নষ্ট বা বিকৃত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু অপটিক্যাল ফাইবারে বিদ্যুৎ নয়, আলো প্রবাহিত হয়; তাই এর ওপর বাইরের কোনো চুম্বকীয় বা বৈদ্যুতিক ক্ষেত্রের বিন্দুমাত্র প্রভাব পড়ে না।
- ৪. উচ্চ নিরাপত্তা (High Security): তামার তার থেকে রেডিও সিগন্যাল আড়িপেতে (Tapping) শোনা সহজ। কিন্তু অপটিক্যাল ফাইবার থেকে আলো লিক হয় না বললেই চলে। যদি কেউ ফাইবার কেটে ডেটা চুরি করার চেষ্টা করে, তবে ফাইবারের ভেতর আলোর প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয় এবং তাৎক্ষণিকভাবে তা মনিটরিং সিস্টেমে ধরা পড়ে যায়। সামরিক এবং ব্যাংকিং যোগাযোগের ক্ষেত্রে এই নিরাপত্তা অপরিহার্য।
- ৫. ওজন ও আকার (Lightweight and Size): অপটিক্যাল ফাইবার অত্যন্ত হালকা এবং সরু। এক হাজার তামার তারের একটি মোটা ক্যাবলের সমান ডেটা বহন করতে পারে চুলের মতো সরু একটি অপটিক্যাল ফাইবার। ফলে মাটির নিচ দিয়ে বা সমুদ্রের তলদেশ দিয়ে ক্যাবল টানা অনেক সহজ ও সাশ্রয়ী। [উৎস: বাংলাপিডিয়া – বাংলাদেশ জাতীয় জ্ঞানকোষ]
অসুবিধা ও সীমাবদ্ধতা (Disadvantages and Limitations) অপটিক্যাল ফাইবারের বহুবিধ সুবিধা থাকা সত্ত্বেও এর কিছু বাস্তব সীমাবদ্ধতা রয়েছে:
১. প্রাথমিক স্থাপন ব্যয় (High Initial Cost): অপটিক্যাল ফাইবার ক্যাবলের দাম আগের চেয়ে কমলেও এর ট্রান্সমিটার, রিসিভার, অপটিক্যাল সুইচ এবং অন্যান্য যন্ত্রপাতির দাম এখনও তামার তারের যন্ত্রপাতির তুলনায় অনেক বেশি।
২. ভঙ্গুরতা (Fragility): কাচের তৈরি হওয়ায় অপটিক্যাল ফাইবার তামার তারের মতো যথেচ্ছভাবে বাঁকানো বা টানা যায় না। অতিরিক্ত বাঁকালে (Bending radius অতিক্রম করলে) ফাইবার ভেঙে যেতে পারে বা আলোর পূর্ণ অভ্যন্তরীণ প্রতিফলন নষ্ট হয়ে সংকেত হারিয়ে যেতে পারে।
৩. জোড়া লাগানো কঠিন (Splicing Difficulty): দুটি কাটা অপটিক্যাল ফাইবারকে জোড়া লাগানো বা স্প্লাইসিং করা অত্যন্ত জটিল এবং সময়সাপেক্ষ কাজ। এর জন্য ‘ফিউশন স্প্লাইসার’ (Fusion Splicer) নামক অত্যন্ত দামি ও সূক্ষ্ম যন্ত্রের প্রয়োজন হয় এবং দক্ষ কারিগরের উপস্থিতি অপরিহার্য। [উৎস: ফাইবার অপটিক ইন্সটলারস ফিল্ড ম্যানুয়াল]
ব্যবহারিক প্রয়োগ (Practical Applications of Optical Fiber) অপটিক্যাল ফাইবারের বহুমুখী প্রয়োগ বর্তমান মানবসভ্যতাকে অভাবনীয় গতিশীলতা প্রদান করেছে:
-
টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা (Telecommunications): ইন্টারনেট, টেলিফোন এবং ক্যাবল টেলিভিশন (CATV) নেটওয়ার্কে অপটিক্যাল ফাইবার সর্বাধিক ব্যবহৃত হচ্ছে। সমুদ্রের নিচ দিয়ে আন্তঃমহাদেশীয় সাবমেরিন ক্যাবলের মাধ্যমে পুরো পৃথিবী আজ একটি গ্লোবাল ভিলেজে পরিণত হয়েছে।
-
চিকিৎসা বিজ্ঞান (Medical Field): চিকিৎসাক্ষেত্রে অপটিক্যাল ফাইবারের ব্যবহার যুগান্তকারী। ‘এন্ডোস্কোপি’ (Endoscopy) বা ‘ল্যাপারোস্কোপি’ (Laparoscopy)-এর মতো শল্যচিকিৎসায় রোগীর পেট না কেটে একটি সরু নলের ভেতর দিয়ে অপটিক্যাল ফাইবার প্রবেশ করিয়ে শরীরের ভেতরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গের স্পষ্ট ছবি মনিটরে দেখা যায়। এছাড়া উচ্চ ক্ষমতার লেজার রশ্মিকে অপটিক্যাল ফাইবারের মাধ্যমে নিখুঁতভাবে শরীরের নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছে দিয়ে কিডনির পাথর ভাঙা বা টিউমার অপসারণের মতো জটিল সার্জারি করা হয়।
-
শিল্পকারখানা ও সেন্সর (Industrial and Sensors): শিল্পকারখানায় যেখানে প্রচণ্ড তাপমাত্রা, তেজস্ক্রিয়তা বা বিস্ফোরক গ্যাস থাকার কারণে মানুষের প্রবেশ ঝুঁকিপূর্ণ, সেখানে অপটিক্যাল ফাইবার সেন্সর ব্যবহার করে তাপমাত্রা, চাপ এবং রাসায়নিক পদার্থের ঘনত্ব মাপা হয়।
-
আলোকসজ্জা (Illumination): বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী এবং নিরাপদ হওয়ায় আধুনিক স্থাপত্যবিদ্যা, জাদুঘর, সুইমিং পুল এবং গাড়ির ভেতরের নান্দনিক আলোকসজ্জায় ফাইবার অপটিক লাইটিং ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। [উৎস: অ্যাপ্লিকেশনস অফ অপটিক্যাল ফাইবারস – জে. এম. সিনিয়র]
বাংলাদেশে অপটিক্যাল ফাইবারের বিকাশ ও ব্যবহার (Development and Use of Optical Fiber in Bangladesh) যদিও বাংলাদেশে অপটিক্যাল ফাইবার উৎপাদনের কোনো নিজস্ব ব্যবস্থা বা কারখানা নেই, তথাপি গত দুই দশকে এ দেশে টেলিযোগাযোগ এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাতে অপটিক্যাল ফাইবারের ব্যবহার গাণিতিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। নব্বইয়ের দশকের শেষভাগ থেকে বাংলাদেশে ফাইবার অপটিক প্রযুক্তির যাত্রা শুরু হয়।
উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশ রেলওয়ে (Bangladesh Railway) তাদের ট্রেনের সিগন্যালিং ব্যবস্থা আধুনিকীকরণ এবং নিজস্ব টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার প্রয়োজনে সর্বপ্রথম রেললাইনের পাশ দিয়ে অপটিক্যাল ফাইবারের বিশাল নেটওয়ার্ক কাঠামো গড়ে তোলে। পরবর্তীকালে এই নেটওয়ার্কের উদ্বৃত্ত ব্যান্ডউইথ মোবাইল অপারেটরদের লিজ দেওয়া হয়, যা দেশের মোবাইল নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণে ব্যাপক ভূমিকা রাখে। সরকারি প্রতিষ্ঠান বিটিসিএল (Bangladesh Telecommunication Company Limited) দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শহরের টেলিফোন এক্সচেঞ্জগুলোর মধ্যে তামার তারকে প্রতিস্থাপন করে অপটিক্যাল ফাইবার কোর ব্যবহার শুরু করে, যার ফলে টেলিফোন কল ড্রপ কমে যায় এবং কলের মান উন্নত হয়।
লোকাল এরিয়া নেটওয়ার্ক বা ল্যান (LAN) গড়ে তোলার জন্যও বাংলাদেশে এ প্রযুক্তির ব্যবহার ক্রমেই বেড়ে চলেছে। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্পোরেট অফিসে নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সংযোগের জন্য ফাইবার ল্যান ব্যবহৃত হচ্ছে। সিলেটে অবস্থিত শাহ্জালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় তাদের বিশাল ক্যাম্পাসের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগের জন্য অপটিক্যাল ফাইবারের একটি শক্তিশালী ল্যান কাঠামো স্থাপন করেছে। বর্তমানে দেশের প্রায় প্রতিটি ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠান তাদের শাখাগুলোর মধ্যে নিরাপদ যোগাযোগের জন্য অপটিক্যাল ফাইবার ব্যবহার করছে।
বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় মাইলফলক অর্জিত হয় ২০০৬ সালের মে মাসে, যখন বাংলাদেশ ‘সি-মি-উই-৪’ (SEA-ME-WE 4 – South East Asia-Middle East-Western Europe 4) নামক একটি উচ্চ-ক্ষমতার সাবমেরিন অপটিক্যাল ফাইবার ক্যাবলের সাথে যুক্ত হয়। বঙ্গোপসাগরের তলা দিয়ে কক্সবাজারের ল্যান্ডিং স্টেশনের মাধ্যমে এই ক্যাবলটি ঢাকা ও চট্টগ্রামকে সরাসরি সিঙ্গাপুর, মধ্যপ্রাচ্য এবং ইউরোপের সঙ্গে যুক্ত করেছে। বাংলাদেশ সাবমেরিন ক্যাবল কোম্পানি লিমিটেড (BSCCL) এর তদারকি করে। এটি বাংলাদেশকে ‘গ্লোবাল ইনফরমেশন সুপার হাইওয়ে’-এর সঙ্গে সংযুক্ত করে পৃথিবীর অন্যান্য দেশের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে এক অভাবনীয় বিপ্লব সাধন করেছে। এই ক্যাবলের ব্যবহার দেশে ইন্টারনেট ব্রাউজিংয়ের গতি প্রচণ্ডভাবে বৃদ্ধি করেছে, থ্রি-জি (3G) এবং ফোর-জি (4G) মোবাইল ইন্টারনেটের বিস্তার ঘটিয়েছে এবং আন্তর্জাতিক টেলিফোন কলগুলির মূল্য ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়েছে।
প্রথম সাবমেরিন ক্যাবলের ওপর নির্ভরতা কমানো এবং ক্রমবর্ধমান ব্যান্ডউইথের চাহিদা মেটানোর জন্য ২০১৭ সালে পটুয়াখালীর কুয়াকাটায় ল্যান্ডিং স্টেশনের মাধ্যমে বাংলাদেশ দ্বিতীয় সাবমেরিন ক্যাবল ‘সি-মি-উই-৫’ (SEA-ME-WE 5)-এর সাথে যুক্ত হয়। বর্তমানে তৃতীয় সাবমেরিন ক্যাবল ‘সি-মি-উই-৬’ (SEA-ME-WE 6) স্থাপনের কাজ চলমান রয়েছে। এছাড়া দেশে অভ্যন্তরীণ নেটওয়ার্ক শক্তিশালী করার জন্য ফাইবার অ্যাট হোম (Fiber@Home) এবং সামিট কমিউনিকেশনস (Summit Communications)-এর মতো ন্যাশনওয়াইড টেলিকমিউনিকেশন ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক (NTTN) কোম্পানিগুলো সারা দেশের ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত হাজার হাজার কিলোমিটার ভূগর্ভস্থ অপটিক্যাল ফাইবার নেটওয়ার্ক স্থাপন করেছে। বর্তমানে বাংলাদেশের গ্রামগঞ্জেও ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট পৌঁছে গেছে মূলত এই অপটিক্যাল ফাইবারের কল্যাণে। [উৎস: বাংলাদেশ সাবমেরিন ক্যাবল কোম্পানি লিমিটেড (BSCCL) এবং বিটিআরসি (BTRC) বার্ষিক প্রতিবেদন]
উপসংহার (Conclusion)
পরিশেষে বলা যায়, একুশ শতকের আধুনিক ডিজিটাল সভ্যতার যে চরম উৎকর্ষ আমরা আজ উপভোগ করছি, তার ভিত্তিমূলে রয়েছে অপটিক্যাল ফাইবার। কাচের একটি সরু সুতোর ভেতর দিয়ে আলোকে আটকে রেখে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে তথ্য আদান-প্রদান করার এই বৈজ্ঞানিক যাদু মানুষের জীবনযাত্রা, শিক্ষা, চিকিৎসা, অর্থনীতি এবং যোগাযোগ ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছে। বাংলাদেশেও ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ গড়ার স্বপ্ন বাস্তবায়নে এবং স্মার্ট বাংলাদেশের দিকে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে অপটিক্যাল ফাইবার নেটওয়ার্ক এক নীরব কিন্তু সবচেয়ে শক্তিশালী চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে চলেছে। ভবিষ্যতে কোয়ান্টাম ক্রিপ্টোগ্রাফি এবং মহাকাশ যোগাযোগের মতো ক্ষেত্রগুলোতেও অপটিক্যাল ফাইবার প্রযুক্তির অবিস্মরণীয় অবদান রাখার সম্ভাবনা উন্মুক্ত হচ্ছে। [উৎস: বাংলাপিডিয়া – বাংলাদেশ জাতীয় জ্ঞানকোষ]