দাউদ পুরস্কার’ বা দাউদ সাহিত্য পুরস্কার হলো পাকিস্তান আমলে প্রবর্তিত একটি অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ সাহিত্য সম্মাননা। তৎকালীন অবিভক্ত পাকিস্তানে (পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান) সাহিত্য, গবেষণা ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায় বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ এই পুরস্কার প্রদান করা হতো।
প্রবর্তন ও পৃষ্ঠপোষকতা
পাকিস্তানের বিখ্যাত শিল্পগোষ্ঠী ‘দাউদ গ্রুপ’-এর অঙ্গসংগঠন দাউদ ফাউন্ডেশন ১৯৫৯ সালে এই পুরস্কারটি প্রবর্তন করে। বাংলা, উর্দু এবং পাকিস্তানের অন্যান্য আঞ্চলিক ভাষায় রচিত শ্রেষ্ঠ মৌলিক সাহিত্যকর্ম, গবেষণা গ্রন্থ ও অনুবাদের জন্য প্রতি বছর এই পুরস্কার দেওয়া হতো। সেসময় এটি ছিল পাকিস্তানের অন্যতম সর্বোচ্চ আর্থিক মূল্যমানের সাহিত্য পুরস্কার।
বাঙালি সাহিত্যিকদের অর্জন
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার আগে, অর্থাৎ পূর্ব পাকিস্তান পর্বে তৎকালীন অনেক বরেণ্য বাঙালি সাহিত্যিক, গবেষক ও প্রাবন্ধিক তাঁদের অমর সৃষ্টির জন্য এই দাউদ পুরস্কার লাভ করেছিলেন। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকজন হলেন:
-
মোহাম্মদ ওয়ালিউল্লাহ: ১৯৬৮ সালে তাঁর অসামান্য স্মৃতিচারণ ও ইতিহাসভিত্তিক গ্রন্থ ‘যুগ-বিচিত্রা’-এর জন্য তিনি এই পুরস্কার লাভ করেন।
-
শহীদুল্লা কায়সার: ১৯৬২ সালে তাঁর কালজয়ী উপন্যাস ‘সংশপ্তক’-এর জন্য।
-
মুনীর চৌধুরী: ১৯৬৫ সালে তাঁর বিখ্যাত প্রবন্ধগ্রন্থ ‘মীর মানস’-এর জন্য।
-
শওকত ওসমান: ১৯৬৬ সালে তাঁর রূপক ও রাজনৈতিক উপন্যাস ‘ক্রীতদাসের হাসি’-এর জন্য (যদিও আইয়ুব খানের স্বৈরশাসনের সমালোচনা করে লেখা এই বইটির জন্য খোদ আইয়ুব খানের সরকার সমর্থিত পুরস্কার পাওয়াটা ছিল একটি ঐতিহাসিক পরিহাস)।
-
আবু ইসহাক: তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস ‘পদ্মার পলিদ্বীপ’-এর জন্য।
-
আলাউদ্দিন আল আজাদ: তাঁর সাহিত্যকর্মের জন্য।
বিলুপ্তি
১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার পর, স্বাভাবিকভাবেই এ দেশে দাউদ পুরস্কারের প্রাসঙ্গিকতা ও অস্তিত্ব বিলুপ্ত হয়ে যায়। তবে স্বাধীনতাপূর্ব বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এবং সেসময়ের বাঙালি লেখকদের সাহিত্যকর্ম মূল্যায়নের ক্ষেত্রে একটি ঐতিহাসিক মাপকাঠি হিসেবে ‘দাউদ পুরস্কার’-এর নাম আজও স্মরণ করা হয়।