দেওপাড়া প্রশস্তি প্রাচীন বাংলার সেন রাজবংশের ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ, নির্ভরযোগ্য এবং প্রামাণ্য শিলালিপি। এটি অধুনা বাংলাদেশের রাজশাহী জেলার গোদাগাড়ী উপজেলার অন্তর্গত দেওপাড়া নামক গ্রামে আবিষ্কৃত হয়েছে। ১৮৬৫ সালে সি. টি. মেটকাফ (C. T. Metcalfe) একটি বিশাল দিঘির (পদ্মসরোবর) কাছে পাথরের গায়ে উৎকীর্ণ এই ঐতিহাসিক শিলালিপিটি আবিষ্কার করেন। বর্তমানে এটি কলকাতার ভারতীয় জাদুঘরে (Indian Museum) সংরক্ষিত রয়েছে।
রচয়িতা ও খোদাইকার
-
রচয়িতা: এই প্রশস্তির রচয়িতা হলেন প্রখ্যাত সংস্কৃত কবি উমাপতি ধর, যিনি পরবর্তীকালে রাজা লক্ষ্মণ সেনের রাজসভার ‘পঞ্চরত্ন’-এর অন্যতম সদস্য হিসেবে খ্যাতি লাভ করেছিলেন। এটি অত্যন্ত সুলিখিত ও ছন্দোবদ্ধ সংস্কৃত ভাষায় ৩৬টি শ্লোকে রচিত।
-
খোদাইকার: শিলালিপিটি পাথরের গায়ে অত্যন্ত নিপুণভাবে খোদাই করেছিলেন বরেন্দ্র অঞ্চলের তৎকালীন শ্রেষ্ঠ ভাস্কর শূলপাণি। প্রশস্তিতেই তাঁর নামোল্লেখ করে তাঁকে ‘বরেন্দ্রক শিল্পীগোষ্ঠীর চূড়ামণি’ (বরেন্দ্র অঞ্চলের শিল্পীদের মুকুটমণি) বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে।
মূল বিষয়বস্তু এই প্রশস্তির মূল উদ্দেশ্য ছিল সেন সাম্রাজ্যের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা পরাক্রমশালী রাজা বিজয় সেনের সামরিক সাফল্য, বংশগৌরব এবং ধর্মীয় কীর্তির বন্দনা করা।
-
বংশপরিচয় ও আদি নিবাস: এই শিলালিপিতেই সেন রাজাদের আদি নিবাস দাক্ষিণাত্যের ‘কর্ণাটক’ অঞ্চল এবং তাঁদের চন্দ্রবংশীয় ‘ব্রহ্মক্ষত্রিয়’ পরিচয়ের সুস্পষ্ট ঐতিহাসিক উল্লেখ রয়েছে। এতে সেন বংশের আদি পুরুষ বীরসেন থেকে শুরু করে সামন্ত সেন, হেমন্ত সেন এবং বিজয় সেনের রাজবংশানুক্রমিক বিবরণ দেওয়া হয়েছে।
-
বিজয় সেনের সামরিক পরাক্রম: এতে উল্লেখ আছে যে, বিজয় সেন নান্য, বীর, রাঘব ও বর্ধন নামক রাজাদের পরাজিত করেছিলেন। এছাড়া তিনি পাল রাজাদের পরাস্ত করে গৌড় অধিকার করেন এবং কামরূপ (আসাম) ও কলিঙ্গ (উড়িষ্যা)-এর রাজাদের পরাজিত করে সেন সাম্রাজ্যের ব্যাপক বিস্তৃতি ঘটিয়েছিলেন।
-
প্রদ্যুম্নেশ্বর মন্দির নির্মাণ: প্রশস্তির শেষাংশে বিজয় সেন কর্তৃক দেওপাড়ায় ‘প্রদ্যুম্নেশ্বর’ (শিব ও বিষ্ণুর সম্মিলিত রূপ) নামক একটি সুবিশাল ও মনোরম মন্দির নির্মাণের বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে। মন্দিরটির জাঁকজমক এবং এর সংলগ্ন দিঘিটি কেমন ছিল, তার কাব্যিক বর্ণনা এতে পাওয়া যায়।
ঐতিহাসিক গুরুত্ব প্রাচীন বাংলার ইতিহাসের পুনর্গঠনে দেওপাড়া প্রশস্তির গুরুত্ব অপরিসীম। পাল সাম্রাজ্যের পতনের পর সেনরা কীভাবে বাংলার রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেছিল এবং রাজা বিজয় সেন কীভাবে নিজ শৌর্যে একটি ক্ষুদ্র সামন্ত রাজ্যকে এক সুবিশাল ও স্বাধীন সাম্রাজ্যে পরিণত করেছিলেন, তার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ও প্রাথমিক উৎস (Primary Source) হলো এই শিলালিপি। রাজনৈতিক ইতিহাসের পাশাপাশি একাদশ-দ্বাদশ শতাব্দীর প্রাচীন বাংলার সংস্কৃত সাহিত্যচর্চা, ভাস্কর্য ও স্থাপত্যশিল্পের উৎকর্ষ অনুধাবনের ক্ষেত্রেও এটি ইতিহাসবিদদের জন্য এক অমূল্য দলিল।