প্রদ্যুম্নেশ্বর

‘প্রদ্যুম্নেশ্বর’ হলো প্রাচীন বাংলার সেন রাজবংশের পরাক্রমশালী শাসক রাজা বিজয় সেন কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত একটি ঐতিহাসিক মন্দির এবং সেই মন্দিরের প্রধান আরাধ্য দেবতার নাম। অধুনা বাংলাদেশের রাজশাহী জেলার গোদাগাড়ী উপজেলার অন্তর্গত দেওপাড়া গ্রামে একাদশ-দ্বাদশ শতাব্দীতে এই সুবিশাল ও জাঁকজমকপূর্ণ মন্দিরটি নির্মাণ করা হয়েছিল। বিখ্যাত ঐতিহাসিক শিলালিপি ‘দেওপাড়া প্রশস্তি’ মূলত এই মন্দির নির্মাণের স্মৃতি ও পুণ্য রক্ষার্থেই উৎকীর্ণ করা হয়েছিল।

দেবতার স্বরূপ ও ধর্মীয় সমন্বয়

‘প্রদ্যুম্নেশ্বর’ মূলত একটি সমন্বয়বাদী বা মিশ্র দেবতার রূপ, যা প্রাচীন বাংলার ধর্মীয় সম্প্রীতির এক অসামান্য নিদর্শন।

  • হরি-হর মূর্তি: হিন্দু ধর্মে ‘প্রদ্যুম্ন’ বলতে সাধারণত ভগবান বিষ্ণুর (বা কৃষ্ণের পুত্র) একটি রূপকে বোঝায়, আর ‘ঈশ্বর’ বলতে ভগবান শিবকে বোঝায়। শিব ও বিষ্ণুর এই সম্মিলিত রূপকেই বলা হয় ‘হরি-হর’।

  • বিজয় সেনের উদারতা: সেন বংশের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা রাজা বিজয় সেন ব্যক্তিগতভাবে শৈব (শিবের উপাসক) ছিলেন। তা সত্ত্বেও শিব ও বিষ্ণুর উপাসকদের মধ্যে বিভেদ দূর করে একটি ঐক্যবদ্ধ ধর্মীয় সংস্কৃতি গড়ে তোলার মহৎ উদ্দেশ্যেই তিনি শিব ও বিষ্ণুর অভিন্ন রূপ হিসেবে এই ‘প্রদ্যুম্নেশ্বর’ মূর্তির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

দেওপাড়া প্রশস্তিতে মন্দিরের বর্ণনা

রাজা লক্ষ্মণ সেনের রাজসভার অন্যতম রত্ন এবং প্রখ্যাত কবি উমাপতি ধর রচিত ‘দেওপাড়া প্রশস্তি’-তে প্রদ্যুম্নেশ্বর মন্দিরের অত্যন্ত বিশদ ও কাব্যিক বর্ণনা পাওয়া যায়:

  • স্থাপত্যের বিশালতা: প্রশস্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এই মন্দিরটি এতই উঁচু ও সুদৃশ্য ছিল যে এর চূড়া যেন আকাশ স্পর্শ করত এবং এর স্বর্ণখচিত কলস বহুদূর থেকে দৃশ্যমান ছিল।

  • পদ্মসরোবর: মন্দিরের সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য এবং পুণ্যার্থীদের সুবিধার্থে রাজা মন্দিরের সামনে একটি সুবিশাল দিঘি খনন করেছিলেন। প্রশস্তিতে এটিকে ‘পদ্মসরোবর’ বলা হয়েছে, যা আজও দেওপাড়ায় ‘পদ্মদীঘি’ নামে পরিচিত।

  • উপাদান ও কারুকাজ: মন্দিরটি নির্মাণে অত্যন্ত মূল্যবান পাথর এবং কারুকার্যময় ভাস্কর্য ব্যবহার করা হয়েছিল, যা প্রাচীন বাংলার মন্দির স্থাপত্য ও ভাস্কর্য শিল্পের চরম উৎকর্ষের প্রমাণ দেয়।

বর্তমান অবস্থা

কালের বিবর্তনে, প্রাকৃতিক বিপর্যয় এবং পরবর্তীকালের নানা ধ্বংসযজ্ঞের কারণে মূল প্রদ্যুম্নেশ্বর মন্দিরটির কোনো কাঠামোগত অস্তিত্ব আজ আর টিকে নেই। তবে ১৮৬৫ সালে সি. টি. মেটকাফ দেওপাড়ার সেই পদ্মসরোবর বা পদ্মদীঘির পাড় থেকেই বিখ্যাত দেওপাড়া প্রশস্তির শিলালিপিটি উদ্ধার করেন (যা ভাস্কর শূলপাণি খোদাই করেছিলেন)। বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া এই অসামান্য স্থাপত্যকীর্তি এবং প্রাচীন বাংলার ধর্মীয় ইতিহাসের একমাত্র অকাট্য প্রামাণ্য দলিল হিসেবে শিলালিপিটি আজও টিকে রয়েছে।