পঞ্চরত্ন বলতে প্রাচীন বাংলার ইতিহাসে সেন রাজবংশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শাসক রাজা লক্ষ্মণ সেনের রাজসভার পাঁচজন বিখ্যাত পণ্ডিত ও সংস্কৃত কবিকে বোঝানো হয়। প্রাচীন ভারতের রাজা বিক্রমাদিত্যের রাজসভার ‘নবরত্ন’-এর মতো লক্ষ্মণ সেনের রাজসভাও এই পাঁচজন মহারত্নের উপস্থিতিতে সংস্কৃত সাহিত্যচর্চার এক অনন্য কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল।
এই পাঁচজন বিখ্যাত কবি ও তাঁদের অবদান নিচে তুলে ধরা হলো:
-
জয়দেব: তিনি ছিলেন পঞ্চরত্নের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ এবং সর্বাধিক পরিচিত। তাঁর রচিত অমর কাব্য ‘গীতগোবিন্দম’ সংস্কৃত সাহিত্যের এক অমূল্য সম্পদ। এই কাব্যে রাধা-কৃষ্ণের প্রেমলীলা অসাধারণ ছন্দে ও মাধুর্যে বর্ণিত হয়েছে, যা আজও সমগ্র ভারত উপমহাদেশে ব্যাপকভাবে সমাদৃত।
-
ধোয়ী: তিনি মহাকবি কালিদাসের বিখ্যাত ‘মেঘদূত’ কাব্যের অনুকরণে ‘পবনদূত’ নামক একটি চমৎকার সংস্কৃত খণ্ডকাব্য রচনা করেছিলেন। এই কাব্যে পবন বা বাতাসকে দূত হিসেবে কল্পনা করে বার্তা প্রেরণের কাহিনি বর্ণিত হয়েছে।
-
উমাপতি ধর: তিনি ছিলেন একাধারে প্রখ্যাত কবি ও মন্ত্রী। সেন সাম্রাজ্যের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা রাজা বিজয় সেনের রাজত্বকালের ঐতিহাসিক বিবরণ সংবলিত বিখ্যাত শিলালিপি ‘দেওপাড়া প্রশস্তি’ তাঁরই রচনা। তিনি লক্ষ্মণ সেনের রাজসভায়ও একজন অত্যন্ত সম্মানিত সদস্য ছিলেন।
-
গোবর্ধন আচার্য: তিনি ছিলেন রাজসভার আরেকজন খ্যাতনামা পণ্ডিত। তাঁর রচিত বিখ্যাত শ্লোক সংকলন ‘আর্যাসপ্তশতী’ প্রাচীন বাংলার গ্রামীণ সমাজ, প্রকৃতি ও সাহিত্য অনুধাবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি গ্রন্থ।
-
শরণ: তিনি ছিলেন এই রাজসভার অন্যতম বিদগ্ধ সংস্কৃত কবি। তাঁর রচিত কোনো পূর্ণাঙ্গ কাব্যগ্রন্থ পাওয়া না গেলেও, তৎকালীন বিখ্যাত সংকলন গ্রন্থ ‘সদুক্তিকর্ণামৃত’-এ তাঁর রচিত অসংখ্য চমৎকার শ্লোক সংরক্ষিত রয়েছে।
রাজা লক্ষ্মণ সেন নিজেও একজন পণ্ডিত ব্যক্তি এবং সাহিত্যের সমঝদার ছিলেন। তাঁর উদার পৃষ্ঠপোষকতায় এই ‘পঞ্চরত্ন’-এর সাহিত্যসাধনা প্রাচীন বাংলার সংস্কৃত সাহিত্যকে এক স্বর্ণযুগে প্রবেশ করিয়েছিল।