ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর

ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর ছিলেন বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগের সর্বশেষ ধ্রুপদী কবি এবং অষ্টাদশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ প্রতিভাধর সাহিত্যিক। ১৭১২ খ্রিস্টাব্দে হাওড়া জেলার পেঁড়ো-বসন্তপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করা এই কবি তাঁর অসামান্য কবিত্বশক্তি, শব্দচয়ন এবং অলঙ্কার প্রয়োগের জন্য আজও বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন। তাঁর জীবনের একটা বড় অংশ কেটেছে দারিদ্র্য ও প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে, কিন্তু সেই প্রতিকূলতা জয় করেই তিনি নদিয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের রাজসভার সভাকবি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায় তাঁর এই অসাধারণ কবিত্বগুণের স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে ‘রায়গুণাকর’ উপাধিতে ভূষিত করেন। তাঁর সাহিত্যকর্ম বাংলা কাব্যের মধ্যযুগীয় ধারার এক চরম উৎকর্ষের নিদর্শন।

ভারতচন্দ্রের শ্রেষ্ঠ কীর্তি হলো ‘অন্নদামঙ্গল’ কাব্য, যা ১৭৫২-৫৩ সালের দিকে রচিত। এই কাব্যটি কেবল একটি ধর্মীয় আখ্যান নয়, বরং এটি মধ্যযুগের বাংলার সমাজ ও রাজনীতির এক জীবন্ত দলিল। অন্নদামঙ্গল কাব্যটি মূলত তিনটি খণ্ডে বিভক্ত, অন্নদামঙ্গল, দানলীলা বা মানসিংহ এবং বিদ্যাসুন্দর। এর মধ্যে ‘বিদ্যাসুন্দর’ অংশটি তৎকালীন পাঠকসমাজে অভূতপূর্ব জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। দেবী অন্নদার মর্ত্যে আগমন এবং তাঁর অলৌকিক লীলার বর্ণনা যেমন এই কাব্যে আছে, তেমনি তৎকালীন সামাজিক রীতি-নীতি, রাজদরবারের পরিবেশ এবং মানবীয় প্রেমের এক অপরূপ সংমিশ্রণ এখানে ফুটে উঠেছে। তাঁর কাব্যের ভাষা ছিল অত্যন্ত সমৃদ্ধ; বাংলা শব্দের পাশাপাশি সংস্কৃত, ফারসি, আরবি ও হিন্দুস্তানি ভাষার সুনিপুণ ব্যবহারের মাধ্যমে তিনি এক নতুন ধ্রুপদী শৈলী তৈরি করেছিলেন।

ভারতচন্দ্র তাঁর কাব্যে যে গভীর ছন্দবোধ এবং ভাষার কারুকার্য দেখিয়েছেন, তা পরবর্তীকালের বাংলা সাহিত্যের পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করেছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ভারতচন্দ্রের কাব্যশৈলীর ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন এবং তাঁর কাব্যকে ‘রাজকণ্ঠের মণিমালা’র সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। আসলে, ভারতচন্দ্রের হাতেই বাংলা কাব্য ভাষা তার মধ্যযুগীয় সরলতা থেকে বেরিয়ে এসে এক উচ্চাঙ্গের শৈল্পিক রূপ লাভ করেছিল। ঈশ্বরী পাটনী চরিত্রের সেই অমর উক্তি, “আমার সন্তান যেন থাকে দুধে-ভাতে,” আজও প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে পরম মমতার সাথে গেঁথে আছে। এই একটি মাত্র পঙ্‌ক্তি কোনো কবির সর্বশ্রেষ্ঠ কৃতিত্বের পরিচায়ক হতে পারে, কারণ এতে ফুটে উঠেছে একজন সাধারণ মায়ের সন্তানের জন্য অকৃত্রিম আশীর্বাদ ও অভাবহীন জীবনের আকুতি।

মধ্যযুগের কবি হলেও ভারতচন্দ্র ছিলেন আধুনিকতার দিকে এক ধাপ এগিয়ে থাকা ব্যক্তিত্ব। তাঁর কাব্যে দেব-দেবীর অলৌকিকতার বর্ণনার আড়ালে তিনি মানুষের মানবিক আবেগ, দুঃখ-কষ্ট এবং তৎকালীন সমাজের বাস্তবতাকে তুলে ধরেছিলেন। বিদ্যাসুন্দরের কাহিনীতে তিনি মানুষের নিষিদ্ধ প্রেম ও রোমান্টিকতাকে যে সাহসিকতার সাথে চিত্রিত করেছেন, তা সেই সময়ের সামাজিক কাঠামোয় ছিল এক সাহসী পদক্ষেপ। তিনি কেবল पौराणिक চরিত্র আঁকেননি, বরং তাদের মধ্যে মানুষের মতো রক্ত-মাংসের আবেগ সঞ্চার করতে পেরেছিলেন। তাঁর রচনার মধ্যে ‘সত্যপীরের পাঁচালী’, ‘রসমঞ্জরী’, ‘গঙ্গাষ্টক’ এবং ‘নাগাষ্টক’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, যা তাঁর জ্ঞানের গভীরতা ও বহুমুখী প্রতিভার প্রমাণ দেয়।

ভারতচন্দ্রের মৃত্যুর মধ্য দিয়েই বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগের অবসান ঘটে এবং আধুনিক বাংলা সাহিত্যের উন্মেষের পথ প্রশস্ত হয়। তিনি এমন এক সময় কাব্যচর্চা করেছিলেন যখন রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সামাজিক ভাঙাগড়ন চলছিল, কিন্তু সেই অস্থিরতার মাঝেও তিনি তাঁর লেখনীর মাধ্যমে বাংলা ভাষাকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন একই সাথে একজন পন্ডিত, একজন শিল্পী এবং একজন দক্ষ শব্দকুশলী। রাজসভার কবি হওয়া সত্ত্বেও তিনি সাধারণ মানুষের আবেগ এবং লোকজ ঐতিহ্যের সাথে নিজের সংযোগ ছিন্ন করেননি। তাঁর কাব্যের অনেক পঙ্‌ক্তি আজও বাংলা প্রবাদে পরিণত হয়েছে, যা প্রমাণ করে যে তাঁর সাহিত্যিক আবেদন আজও অটুট।

ভারতচন্দ্রের জীবন ও কর্ম নিয়ে ইতিহাসবিদ এবং সাহিত্যিকদের মধ্যে বিভিন্ন সময়ে নানা মতপার্থক্য তৈরি হলেও তাঁর শ্রেষ্ঠত্বের ব্যাপারে প্রায় সবাই একমত। তিনি ছিলেন মধ্যযুগের সেই শেষ উজ্জ্বল নক্ষত্র, যার আলোয় আলোকিত হয়েছিল বাংলার কাব্যাকাশ। অষ্টাদশ শতাব্দীর বাংলার রুচি ও আভিজাত্য তাঁর কাব্যে পরিপূর্ণভাবে প্রতিফলিত। তিনি যখন অন্নদামঙ্গল লিখছিলেন, তখন বাংলা ছিল রাজনৈতিকভাবে এক সন্ধিক্ষণে, কিন্তু সাহিত্যিকভাবে তিনি ছিলেন এক পূর্ণিমার চন্দ্র। তাঁর এই অসাধারণ সৃজনশীলতা এবং ভাষার ওপর অগাধ পাণ্ডিত্য তাঁকে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক উচ্চাসনে অধিষ্ঠিত করেছে।

পরিশেষে বলা যায়, ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর কেবল একজন কবি ছিলেন না, তিনি ছিলেন বাংলা ভাষার একজন শ্রেষ্ঠ স্থপতি। তাঁর নির্মিত কাব্যসৌধ আজো আমাদের বাংলা ভাষার সমৃদ্ধ ইতিহাস মনে করিয়ে দেয়। তাঁর লেখনীর জাদুতেই আমরা পাই মধ্যযুগের সেই সোনালী সময়ের স্বাদ, যেখানে শব্দ আর ছন্দের মিশেলে গড়ে উঠেছিল এক অমূল্য সাহিত্যভাণ্ডার। ভারতচন্দ্র আমাদের শেখান কীভাবে ভাষার অলঙ্কার দিয়ে মানবিক অনুভূতিকে কালজয়ী করা যায়। আজও যারা বাংলা সাহিত্য নিয়ে গবেষণা করেন, তাদের কাছে ভারতচন্দ্র একটি অনিবার্য নাম। তিনি বাংলা কাব্যের সেই ধারাকে পূর্ণতা দিয়েছিলেন যা আজ আমাদের সাহিত্যের মূল ভিত্তি। তাঁর অবদান কেবল কাব্যের সংখ্যায় নয়, বরং গুণগত মান এবং বাংলা ভাষার ওপর তাঁর গভীর প্রভাবের মধ্যেই চিরকাল বেঁচে থাকবে।