হেমেন্দ্রকুমার রায়

হেমেন্দ্রকুমার রায় (জন্ম: ২ সেপ্টেম্বর, ১৮৮৮ – মৃত্যু: ১৮ এপ্রিল, ১৯৬৩) ছিলেন বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ঔপন্যাসিক, গল্পকার, প্রাবন্ধিক, গীতিকার এবং শিশু ও কিশোর সাহিত্যের এক অবিসংবাদিত জাদুকর। বাংলা সাহিত্যে বিজ্ঞান কল্পকাহিনী (Science Fiction), রোমাঞ্চকর অ্যাডভেঞ্চার এবং গোয়েন্দা কাহিনীর আধুনিক রূপায়ণে তিনি ছিলেন অন্যতম প্রধান পথিকৃৎ। বাঙালি কিশোরদের মলাটের ভেতরের এক রহস্যময় ও রোমাঞ্চকর পৃথিবীতে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান অতুলনীয়। (উৎস: সংসদ বাঙালি চরিতাভিধান)

জন্ম ও পারিবারিক প্রেক্ষাপট

হেমেন্দ্রকুমার রায়ের জন্ম হয়েছিল কলকাতায় এক সুসংস্কৃত ও অভিজাত পরিবারে। তাঁর পিতা রাধাপ্রসাদ রায় ছিলেন একজন নাট্যপ্রেমী ও সংস্কৃতিমনা মানুষ। পারিবারিক পরিবেশের কারণেই খুব অল্প বয়স থেকেই হেমেন্দ্রকুমারের মধ্যে শিল্প, সাহিত্য ও সঙ্গীতের প্রতি গভীর অনুরাগের জন্ম হয়। মাত্র চৌদ্দ বছর বয়সে ‘বসুধা’ পত্রিকায় তাঁর প্রথম গল্প প্রকাশিত হয়েছিল। পড়াশোনা শেষ করে তিনি পুরোপুরি সাহিত্যচর্চায় নিজেকে উৎসর্গ করেন। (উৎস: বাংলা শিশুসাহিত্যের ইতিহাস)

জয়ন্ত-মানিক ও বিমল-কুমার: অমর চার চরিত্র

বাংলা কিশোর সাহিত্যে হেমেন্দ্রকুমার রায়ের সবচেয়ে বড় অবদান হলো তাঁর তৈরি করা কালজয়ী চরিত্রগুলো, যা কয়েক প্রজন্ম ধরে বাঙালিকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে:

  • বিমল-কুমার (অ্যাডভেঞ্চার): বাংলা সাহিত্যের প্রথম সফল অ্যাডভেঞ্চার সিরিজ। ‘যক্ষ্মের ধন’ (১৯২০) উপন্যাসের মাধ্যমে বিমল, কুমার এবং তাদের বিশ্বস্ত কুকুর ‘বাঘা’-র আত্মপ্রকাশ ঘটে। এরপর তিনি লিখেছেন ‘আবার যক্ষ্মের ধন’, ‘ময়নামতীর ময়া’ এবং মহাকাব্যিক বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী ‘মেঘদূতের মর্ত্যে আগমন’।

  • জয়ন্ত-মানিক (গোয়েন্দা): বাঙালি গোয়েন্দা ধারায় ‘জয়ন্ত-মানিক’ জুটি অত্যন্ত জনপ্রিয়। জয়ন্ত একজন শৌখিন ও তীক্ষ্ণবুদ্ধিসম্পন্ন গোয়েন্দা, আর মানিক তাঁর সহকারী ও বন্ধু। এদের সাথে প্রায়ই থাকতেন রসিক পুলিশ ইন্সপেক্টর সুন্দরবাবু, যাঁর মুখে “হুম, ড্যামিট!” সংলাপটি বাংলা সাহিত্যে এক অমর লোকগাথায় পরিণত হয়েছে।

বিজ্ঞান কল্পকাহিনী ও ভৌতিক গল্পের রাজা

হেমেন্দ্রকুমার কেবল গোয়েন্দা বা শিকারের গল্পই লেখেননি, তিনি ছিলেন বাংলা সায়েন্স ফিকশনের অন্যতম আদি পুরুষ। তাঁর কল্পবিজ্ঞানের গল্পগুলোতে বৈজ্ঞানিক দূরদর্শিতা এবং রোমাঞ্চের এক চমৎকার ভারসাম্য ছিল। এছাড়া তাঁর অলৌকিক ও ভৌতিক গল্পগুলো (যেমন: ‘রাত্রির যাত্রী’, ‘অশরীরী’ সংকলন) পাঠককে এক গা-ছমছমে ও মনস্তাত্ত্বিক ভয়ের স্বাদ দিত, যা সস্তা ভূতের গল্পের চেয়ে ছিল অনেক আলাদা। (উৎস: সংসদ বাঙালি চরিতাভিধান)

বহুমুখী প্রতিভা: থিয়েটার, সিনেমা ও গান

হেমেন্দ্রকুমার রায়ের প্রতিভা কেবল ছোটদের সাহিত্যের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ ছিল না:

  • গীতিকার ও নাট্যকার: তিনি তৎকালীন বহু বিখ্যাত বাংলা নাটকের গান রচনা করেছিলেন। তাঁর লেখা অনেক গান সে যুগে অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়েছিল।

  • চলচ্চিত্র ও সম্পাদনা: তিনি বিখ্যাত ‘নাচঘর’ পত্রিকা সম্পাদনা করতেন, যা ছিল সেকালের চলচ্চিত্র ও থিয়েটার বিষয়ক অত্যন্ত প্রভাবশালী মুখপত্র। নির্বাক ও সবাক চলচ্চিত্রের শুরুর দিনগুলোতে চিত্রনাট্য রচনা এবং চলচ্চিত্র সমালোচনায় তাঁর অবদান ছিল অগ্রগণ্য। (উৎস: চলচ্চিত্রের নেপথ্য ইতিহাস)

লিখনশৈলী ও ঐতিহাসিক মূল্যায়ন

হেমেন্দ্রকুমারের লেখার ভাষা ছিল অত্যন্ত গতিশীল, মার্জিত এবং ভিজ্যুয়াল। তিনি যখন কোনো আফ্রিকার জঙ্গল, তিব্বতের রহস্যময় গুহা কিংবা কলকাতার কোনো অন্ধকার গলির বর্ণনা দিতেন, পাঠক চোখের সামনে তা দেখতে পেত। তিনি কিশোরদের মনে অজানাকে জানার কৌতূহল, বিজ্ঞানমনস্কতা এবং অদম্য সাহসের বীজ বুনে দিতে পেরেছিলেন।

১৯৬৩ সালের ১৮ এপ্রিল এই মহান রূপকার মৃত্যুবরণ করেন।

উপসংহারে বলা যায়, হেমেন্দ্রকুমার রায় ছিলেন বাংলা কিশোর সাহিত্যের সেই স্বর্ণযুগের নির্মাতা, যা পরবর্তীতে সত্যজিৎ রায় (ফেলুদা), সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় (কাকাবাবু) বা শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো লেখকদের কিশোর সাহিত্য রচনায় গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল। আজ শতবর্ষ পরেও তাঁর ‘যক্ষ্মের ধন’ বা ‘মেঘদূত’ সমানভাবে রোমাঞ্চ জাগায়। (উৎস: সংসদ বাঙালি চরিতাভিধান)