শেরশাহ সুরি

শেরশাহ সুরি (জন্ম: ১৪৮৬ – মৃত্যু: ১৫৪৫ খ্রিস্টাব্দ) ছিলেন ভারত উপমহাদেশের ইতিহাসে অন্যতম শ্রেষ্ঠ সমরনায়ক, দক্ষ প্রশাসক এবং সংস্কারক। বিহারের ক্ষুদ্র এক জায়গিরদারের পুত্র থেকে তিনি নিজস্ব মেধা ও সাহসিকতার জোরে দিল্লির সম্রাট পদে আসীন হয়েছিলেন। তাঁর শাসনামল স্বল্পস্থায়ী হলেও (১৫৪০–১৫৪৫ খ্রিস্টাব্দ), তিনি যে প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন, তা পরবর্তীকালে মোগল সম্রাট আকবরের প্রশাসন ব্যবস্থার মূল অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছিল। (উৎস: ড. সতীশ চন্দ্র, ‘মধ্যযুগীয় ভারত’)

প্রাথমিক জীবন ও উত্থান

শেরশাহের প্রকৃত নাম ছিল ফরিদ খান। তিনি আফগানিস্তানের সুরি বংশের লোক ছিলেন। বিহারের শাসনকর্তা বাহার খান লোহানীর অধীনে কর্মরত থাকাকালীন একাই একটি বাঘ শিকার করে তিনি ‘শের খান’ উপাধি লাভ করেন। তিনি জীবনের একটি বড় অংশ অতিবাহিত করেছিলেন বিহার ও বাংলার রাজনৈতিক উত্থান-পতনের সাক্ষী হিসেবে। বাংলার সুলতানদের সাথে কাজ করার অভিজ্ঞতা তাঁর সামরিক ও প্রশাসনিক জ্ঞানকে দারুণভাবে সমৃদ্ধ করেছিল। (উৎস: আববাস সারওয়ানি, ‘তারীখ-ই-শেরশাহী’)

ক্ষমতালাভ ও সামরিক বিজয়

১৫৩৯ সালে চৌসার যুদ্ধে এবং ১৫৪০ সালে কনৌজের (বিলগ্রাম) যুদ্ধে মোগল সম্রাট হুমায়ুনকে পরাজিত করে শেরশাহ দিল্লির সিংহাসন দখল করেন। তিনি কেবল মোগলদেরই পরাজিত করেননি, বরং বাংলার বিদ্রোহী শাসক এবং রাজপুত রাজ্যগুলোকেও তাঁর নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়েছিলেন। বাংলার রাজনৈতিক অস্থিরতা দূর করে সেখানে তিনি কঠোর প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন। (উৎস: ড. আবদুল করিম, ‘বাংলার ইতিহাস: সুলতানি আমল’)

প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক সংস্কার

শেরশাহের শ্রেষ্ঠত্ব তাঁর সমরকৌশলের চেয়েও তাঁর প্রশাসনিক সংস্কারে বেশি ফুটে ওঠে:

  • রাজস্ব ব্যবস্থা: তিনি জমির উর্বরতা অনুযায়ী কর নির্ধারণের ব্যবস্থা করেছিলেন। রায়তি প্রথা ও পাট্টা-কবুলিয়ত পদ্ধতির প্রবর্তন করে তিনি কৃষকের সাথে সরাসরি রাষ্ট্রের সম্পর্ক তৈরি করেন।

  • মুদ্রা ব্যবস্থা: তিনি রৌপ্যমুদ্রা ‘টাকা’ এবং তাম্রমুদ্রা ‘দাম’ প্রবর্তন করেন। তাঁর এই মুদ্রা ব্যবস্থাই পরবর্তীকালে মোগল ও ব্রিটিশ আমলের মুদ্রা পদ্ধতির ভিত্তি তৈরি করে।

  • যোগাযোগ ব্যবস্থা: বাংলার সোনারগাঁও থেকে সিন্ধু পর্যন্ত বিখ্যাত ‘গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড’ (Grand Trunk Road) নির্মাণ বা সংস্কার ছিল তাঁর অন্যতম সেরা কৃতিত্ব। যাতায়াতের সুবিধার জন্য তিনি রাস্তার পাশে সরাইখানা এবং গাছ লাগানোর ব্যবস্থা করেছিলেন।

  • গুপ্তচর ও ডাক ব্যবস্থা: তিনি সাম্রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তের খবর দ্রুত সংগ্রহের জন্য একটি অত্যন্ত কার্যকর ডাক ব্যবস্থা এবং গুপ্তচর বিভাগ গড়ে তুলেছিলেন।

বিচার ও অসাম্প্রদায়িক নীতি

শেরশাহ কঠোর বিচার ব্যবস্থার প্রবক্তা ছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, “রাজার বিচার যদি পক্ষপাতহীন হয়, তবেই রাজ্যে শান্তি আসে।” তাঁর শাসনামলে সাধারণ মানুষের অধিকার সুরক্ষিত ছিল এবং ব্যবসায়ীরা নিরাপদে বাণিজ্যের সুযোগ পেত। তিনি অসাম্প্রদায়িক নীতি অনুসরণ করতেন এবং হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের যোগ্য ব্যক্তিদের প্রশাসনে নিয়োগ দিয়েছিলেন। তাঁর সেনাবাহিনীতে অনেক হিন্দু সেনাপতি উচ্চ পদে ছিলেন। (উৎস: ড. আর. পি. ত্রিপাঠী, ‘রাইজ অ্যান্ড ফল অফ দ্য মুঘল এম্পায়ার’)

মৃত্যু ও ঐতিহাসিক মূল্যায়ন

১৫৪৫ সালে কালিঞ্জর দুর্গ অবরোধকালে বারুদের বিস্ফোরণে শেরশাহ সুরি মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর মাত্র ৫ বছরের মধ্যে তিনি যে বিশাল সাম্রাজ্য ও প্রশাসনিক কাঠামো তৈরি করে গিয়েছিলেন, তা অতুলনীয়। ঐতিহাসিক ড. ভিনসেন্ট স্মিথ বলেন, “যদি শেরশাহ দীর্ঘকাল বেঁচে থাকতেন, তবে হয়তো মোগল সাম্রাজ্যের কোনো সুযোগই ছিল না।”

উপসংহারে বলা যায়, শেরশাহ সুরি ছিলেন একজন যুগান্তকারী শাসক। তাঁর সংস্কারগুলো কেবল সাময়িক ছিল না, তা ছিল সুদূরপ্রসারী। আজকের আধুনিক ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থার অনেক উপাদানের শেকড় শেরশাহের প্রবর্তিত নিয়মগুলোর মধ্যে খুঁজে পাওয়া যায়। তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে, বংশ নয়, বরং যোগ্যতা এবং জনগণের কল্যাণই একটি সাম্রাজ্যের স্থায়িত্বের মূল ভিত্তি। (উৎস: ড. আবদুল করিম, ‘বাংলার ইতিহাস: সুলতানি আমল’)