নাসিরউদ্দিন মুহাম্মদ হুমায়ুন (শাসনকাল: ১৫৩০–১৫৪০ এবং ১৫৫৫–১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দ) ছিলেন মোগল সাম্রাজ্যের দ্বিতীয় সম্রাট এবং প্রথম সম্রাট বাবরের জ্যেষ্ঠ পুত্র। মোগল ইতিহাসের সবচেয়ে নাটকীয় এবং অস্থির জীবন পার করা সম্রাটদের মধ্যে হুমায়ুন অন্যতম। তাঁর জীবন ছিল ভাগ্য বিড়ম্বনা, সামরিক পরাজয়, দীর্ঘ নির্বাসন এবং পুনরায় সিংহাসন পুনরুদ্ধারের এক অনন্য গাঁথা। (উৎস: জে. এল. মেহতা, ‘অ্যাডভান্সড স্টাডি ইন দ্য হিস্ট্রি অফ মিডিভাল ইন্ডিয়া’)
প্রাথমিক জীবন ও উত্তরাধিকার
১৫০৮ খ্রিস্টাব্দে কাবুলে জন্মগ্রহণ করেন হুমায়ুন। বাবর তাঁর মৃত্যুর আগে হুমায়ুনকে উত্তরাধিকারী মনোনীত করে যান। ১৫৩০ সালে বাবরের মৃত্যুর পর মাত্র ২২ বছর বয়সে হুমায়ুন মোগল সিংহাসনে বসেন। বাবর সাম্রাজ্যের যে ভিত্তি রেখে গিয়েছিলেন, তা হুমায়ুনের জন্য একই সাথে আশীর্বাদ এবং চ্যালেঞ্জ ছিল। হুমায়ুনের ভাইদের (কামরান, হিন্দাল ও আসকারী) সাথে ক্ষমতার অন্তর্দ্বন্দ্ব এবং আফগান ও রাজপুত শক্তির ক্রমবর্ধমান হুমকি তাঁর শাসনামলের শুরুতে বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়ায়। (উৎস: আবুল ফজল, ‘আকবরনামা’)
রাজনৈতিক অস্থিরতা ও আফগান চ্যালেঞ্জ
হুমায়ুনের শাসনের প্রথম দিকে শেরশাহ সুরির উত্থান ছিল মোগলদের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি। হুমায়ুন বাংলার গৌড় বিজয় করলেও, বিহারে শেরশাহের শক্তি তখন অপ্রতিহত। ১৫৩৯ সালে চৌসার যুদ্ধ এবং ১৫৪০ সালে কনৌজের (বিলগ্রাম) যুদ্ধে শেরশাহের কাছে হুমায়ুন শোচনীয়ভাবে পরাজিত হন। এই পরাজয়ের ফলে হুমায়ুনকে দিল্লি ও আগ্রা থেকে বিতাড়িত হয়ে দীর্ঘ ১৫ বছর নির্বাসনে কাটাতে হয়। এই সময়ে তিনি প্রথমে সিন্ধু, তারপর পারস্যের শাহর দরবারে আশ্রয় নেন। (উৎস: আববাস সারওয়ানি, ‘তারীখ-ই-শেরশাহী’)
নির্বাসন ও সিংহাসন পুনরুদ্ধার
পারস্যের সাফাভি সম্রাট শাহ তাহমাস্পের সহায়তায় হুমায়ুন তাঁর হারানো রাজ্য পুনরুদ্ধারের পরিকল্পনা করেন। তিনি কান্দাহার ও কাবুল জয় করে নিজের শক্তি পুনর্গঠিত করেন। ১৫৫৫ সালে শেরশাহ সুরির উত্তরাধিকারীদের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের সুযোগ নিয়ে তিনি পুনরায় ভারতে অভিযান চালান এবং ‘সিরহিন্দের যুদ্ধ’-এ বিজয়ী হয়ে দিল্লির সিংহাসন পুনরুদ্ধার করেন। কিন্তু এই পুনরুত্থান খুব দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। (উৎস: ড. সতীশ চন্দ্র, ‘মধ্যযুগীয় ভারত’)
চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ও শিল্পানুরাগ
হুমায়ুন ছিলেন একজন শিক্ষিত ও সংস্কৃতিমনা শাসক। তিনি জ্যোতির্বিদ্যা, ভূগোল ও গণিতে বিশেষ পারদর্শী ছিলেন।
-
লাইব্রেরি ও স্থাপত্য: তিনি অত্যন্ত জ্ঞানপিপাসু ছিলেন। দিনপঞ্জি অনুযায়ী তিনি প্রতিদিন বিভিন্ন রঙের পোশাক পরতেন, যা গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থানের সাথে সম্পর্কিত ছিল।
-
দ্বীন-ই-ইলাহির ভিত্তি: যদিও তাঁর ছেলে আকবর এটি প্রসারিত করেছিলেন, হুমায়ুন নিজেও বিভিন্ন ধর্মের প্রতি সহনশীল ও আগ্রহী ছিলেন।
-
দ্বীন-পনাহ: তিনি দিল্লিতে ‘দ্বীন-পনাহ’ (Din-panah) নামক একটি শহর নির্মাণের পরিকল্পনা করেছিলেন, যা আজো তাঁর স্থাপত্য প্রীতির সাক্ষ্য বহন করে। (উৎস: প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর, ভারত)
আকস্মিক মৃত্যু
১৫৫৬ সালের জানুয়ারি মাসে হুমায়ুন তাঁর লাইব্রেরির সিঁড়ি থেকে পড়ে গিয়ে গুরুতর আহত হন এবং তিন দিন পর মৃত্যুবরণ করেন। বিখ্যাত ঐতিহাসিক ল্যান-পুলের ভাষায়, “হুমায়ুন সারা জীবন হোঁচট খেতে খেতে চলেছেন এবং হোঁচট খেতে খেতেই তিনি পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন।” তাঁর মৃত্যুকালে মোগল সাম্রাজ্য অত্যন্ত ভঙ্গুর অবস্থায় ছিল, যা থেকে পরবর্তীতে আকবরকে সাম্রাজ্য পুনর্গঠন করতে হয়েছিল। (উৎস: এস. আর. শর্মা, ‘মুঘল এম্পায়ার ইন ইন্ডিয়া’)
ঐতিহাসিক মূল্যায়ন
হুমায়ুন ছিলেন একজন উচ্চশিক্ষিত মানুষ, কিন্তু দক্ষ সামরিক সেনানায়ক হিসেবে তিনি সম্ভবত বাবর বা আকবরের মতো ছিলেন না। তাঁর উদারতা ও ক্ষমাশীলতা অনেক সময়ই তাঁর ভাইদের বিরুদ্ধে ব্যবহারে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল, যা তাঁর সাম্রাজ্যের ক্ষতি করেছিল। তবুও, মোগল সাম্রাজ্যকে বিলুপ্তির হাত থেকে বাঁচিয়ে পুনরায় প্রতিষ্ঠিত করার কৃতিত্ব তাঁরই। হুমায়ুনের সমাধি, যা তাঁর স্ত্রী হামিদা বানু বেগম নির্মাণ করেছিলেন, সেটিই পরবর্তীকালে মোগল স্থাপত্যের (তাজমহলের অগ্রদূত) শ্রেষ্ঠ নিদর্শন হিসেবে বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। (উৎস: ড. আবদুল করিম, ‘বাংলার ইতিহাস: সুলতানি আমল’)
উপসংহারে বলা যায়, হুমায়ুন ছিলেন ত্যাগের ও ধৈর্যের প্রতিমূর্তি। তিনি কেবল সিংহাসন পুনরুদ্ধার করেননি, বরং তিনি মোগল ইতিহাসের সেই সংযোগস্থল ছিলেন যা বাবরী যুগের অস্থিরতাকে আকবরী যুগের স্থিতিশীলতায় রূপান্তরিত হতে সাহায্য করেছিল।