প্রবাসী বঙ্গ-সাহিত্য সম্মিলন (বর্তমানে ‘নিখিল ভারত বঙ্গ-সাহিত্য সম্মিলন’) হলো বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির প্রচার, প্রসার এবং গবেষণার উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত ভারতের অন্যতম প্রাচীন ও মর্যাদাপূর্ণ একটি সাহিত্য সংগঠন। বিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভে যখন বাংলাভাষীরা ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছিলেন, তখন তাঁদের নিজ ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি অকৃত্রিম টান এবং তা রক্ষা করার তাগিদ থেকেই এই সম্মিলনের জন্ম হয়। এই সংগঠনের মূল লক্ষ্য ছিল বাংলার বাইরের অধিবাসী বাঙালিদের মধ্যে বাংলা ভাষা, সাহিত্য এবং সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের একটি শক্তিশালী সেতুবন্ধন তৈরি করা।
প্রতিষ্ঠার প্রেক্ষাপট ও লক্ষ্য:
-
প্রতিষ্ঠার নেপথ্যে: বিংশ শতাব্দীর শুরুতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, অতুলপ্রসাদ সেন, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় এবং শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের মতো কালজয়ী সাহিত্যিকদের উদ্যোগে এই সম্মিলন প্রতিষ্ঠিত হয়। বাংলাভাষী মানুষের মিলনমেলা হিসেবে এটি ছিল এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ। অতুলপ্রসাদ সেন এই সম্মিলনের প্রতিষ্ঠাতাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন এবং তাঁর কর্মজীবন লক্ষ্ণৌতে কাটলেও, তিনি তাঁর হৃদয়ে বাংলা সাহিত্য ও সঙ্গীতের যে আবেগ লালন করতেন, তা এই সংগঠনের মাধ্যমে বৃহত্তর রূপ পায়।
-
উদ্দেশ্য: বাংলার বাইরের বাঙালি সমাজে বাংলা সাহিত্যের চর্চা অব্যাহত রাখা, নতুন লেখকদের উৎসাহিত করা, বাংলা ভাষার শুদ্ধতা বজায় রাখা এবং ভারতের বিভিন্ন ভাষাভাষী মানুষের সাথে সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন গড়ে তোলাই ছিল এই সংগঠনের মূল উদ্দেশ্য।
সম্মিলনের গুরুত্ব ও কার্যপরিধি:
-
সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রসার: এই সম্মিলনের মাধ্যমে প্রতি বছর বিভিন্ন শহরে সাহিত্য অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে কবি, লেখক, সুরকার ও শিল্পীরা সমবেত হন। এটি কেবল একটি আড্ডা বা সমাবেশ নয়, বরং বাংলা সাহিত্যের উৎকর্ষ সাধন ও গবেষণার একটি বড় ক্ষেত্র।
-
প্রকাশনা ও মুখপত্র: ‘উত্তরা’ ছিল এই সম্মিলনের অন্যতম প্রধান মুখপত্র। অতুলপ্রসাদ সেন এই পত্রিকার সম্পাদনার সাথে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। এই মুখপত্রটি বাংলা সাহিত্য এবং সাহিত্যের সমালোচনার প্রসারে অভূতপূর্ব অবদান রেখেছে।
-
অধিবেশন ও নেতৃত্ব: কানপুর, গোরখপুরসহ ভারতের নানা প্রান্তে এই সম্মিলনের অধিবেশনগুলো অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণভাবে পালিত হতো। অতুলপ্রসাদ সেন এই সম্মিলনের অন্যতম সভাপতি ছিলেন, যা তাঁর সাহিত্যিক ও সাংগঠনিক দক্ষতার প্রমাণ দেয়।
বাংলা সংস্কৃতিতে প্রভাব: প্রবাসী বঙ্গ-সাহিত্য সম্মিলন বাংলা সাহিত্যকে ভৌগোলিক সীমানার বাইরে নিয়ে এসে তাকে একটি ‘সর্বভারতীয়’ রূপ দিতে সহায়তা করেছে। যারা নিজেদের মাতৃভূমি থেকে দূরে বসবাস করছিলেন, এই সম্মিলন তাঁদের কাছে ছিল এক টুকরো বাংলাদেশ বা বাংলা। অতুলপ্রসাদ সেনের মতো ব্যক্তিত্বরা যখন এই সংগঠনের হাল ধরেছিলেন, তখন সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি সঙ্গীতকেও তাঁরা এই মঞ্চের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত করেছিলেন। ফলে এটি হয়ে উঠেছিল সাহিত্য ও সঙ্গীতের এক অপূর্ব মিলনকেন্দ্র।