নির্মলেন্দু গুণ (জন্ম: ২১ জুন ১৯৪৫) বাংলাদেশের আধুনিক কাব্যাঙ্গনের অন্যতম জনপ্রিয়, শক্তিমান এবং বহুল পঠিত কবি। তাঁকে মূলত ‘প্রেম ও দ্রোহের কবি’ বলা হয়। তাঁর কবিতায় একদিকে যেমন তীব্র রোমান্টিকতা ও প্রেমের আকুলতা রয়েছে, অন্যদিকে তেমনি রয়েছে শোষণের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ, শ্রেণি-সংগ্রাম এবং রাজনৈতিক সচেতনতা।
জন্ম ও প্রারম্ভিক জীবন
নির্মলেন্দু প্রকাশ গুণ চৌধুরী ১৯৪৫ সালের ২১ জুন নেত্রকোণা জেলার বারহাট্টা উপজেলার কাশবন গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ছোটবেলা থেকেই তাঁর লেখালেখির প্রতি প্রবল ঝোঁক ছিল। ম্যাট্রিকুলেশন পাসের পর তিনি ঢাকায় আসেন এবং পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। ষাটের দশকের উত্তাল রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং স্বাধিকার আন্দোলন তাঁর কবিসত্তাকে দারুণভাবে প্রভাবিত করেছিল।
সাহিত্যিক অবদান ও জনপ্রিয়তা
১৯৭০ সালে তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘প্রেমাংশুর রক্ত চাই’ প্রকাশিত হয়। এই গ্রন্থের ঐতিহাসিক “হুলিয়া” কবিতাটি তাঁকে রাতারাতি ব্যাপক জনপ্রিয়তা এনে দেয় এবং তরুণ প্রজন্মের কাছে তাঁকে দ্রোহের প্রতীকে পরিণত করে। স্বাধীনতা পূর্ববর্তী ও পরবর্তী রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, মুক্তিযুদ্ধ এবং সাধারণ মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম তাঁর কবিতায় অত্যন্ত বলিষ্ঠভাবে উঠে এসেছে।
তাঁর রচিত অন্যতম কালজয়ী একটি কবিতা হলো “স্বাধীনতা, এই শব্দটি কীভাবে আমাদের হলো”। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণকে কেন্দ্র করে লেখা এই কবিতাটি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার এক অমর দলিল হিসেবে বিবেচিত হয়, যা আজও বিভিন্ন জাতীয় অনুষ্ঠানে আবৃত্তি করা হয়।
উল্লেখযোগ্য গ্রন্থাবলি
নির্মলেন্দু গুণের অসংখ্য কাব্যগ্রন্থ, গল্প, উপন্যাস এবং আত্মজীবনীমূলক রচনা রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো:
-
কাব্যগ্রন্থ: প্রেমাংশুর রক্ত চাই, না প্রেমিক না বিপ্লবী, বাংলার মাটি বাংলার জল, তার আগে চাই সমাজতন্ত্র, চাষার ভূষার ধর্ম, দুঃখ করো না, বাঁচো ইত্যাদি।
-
গল্প ও গদ্যগ্রন্থ: আপন দলের মানুষ।
-
আত্মজীবনীমূলক রচনা: আমার ছেলেবেলা, আমার কণ্ঠস্বর, আত্মকথা ১৯৭১।
স্বীকৃতি ও সম্মাননা
বাংলা সাহিত্যে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ নির্মলেন্দু গুণ দেশের প্রায় সব শীর্ষস্থানীয় সম্মাননা লাভ করেছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
-
বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮২)
-
একুশে পদক (২০০১)
-
স্বাধীনতা পুরস্কার (২০১৬)
মূল্যায়ন
নির্মলেন্দু গুণ এমন একজন কবি, যিনি সাধারণ মানুষের মুখের ভাষাকে অত্যন্ত নিপুণভাবে তাঁর কবিতার ভাষায় রূপান্তরিত করেছেন। তাঁর শব্দচয়ন অত্যন্ত সাবলীল, প্রত্যক্ষ এবং আবেগময়, যা খুব সহজেই পাঠকের হৃদয় ছুঁয়ে যায়। তিনি ব্যক্তিগত জীবনে মার্কসীয় দর্শনে গভীরভাবে বিশ্বাসী হলেও, তাঁর কবিতায় প্রেমের যে বহুমাত্রিক ও ঐশ্বর্যময় রূপ ফুটে উঠেছে, তা বাংলা সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ। সমকালীন জীবিত বাঙালি কবিদের মধ্যে তাঁর পাঠকপ্রিয়তা এবং প্রভাব অত্যন্ত ব্যাপক ও সুদূরপ্রসারী।