‘ছুটিখানী মহাভারত’ মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জনপ্রিয় কাব্যগ্রন্থ। এটি মূলত মহাভারতের ‘অশ্বমেধ পর্বের’ একটি বাংলা অনুবাদ, যা সুলতানি আমলে চট্টগ্রাম অঞ্চলের শাসক ছুটিখানের (যিনি নসরৎ খান নামেও পরিচিত) নির্দেশে ও পৃষ্ঠপোষকতায় কবি শ্রীকর নন্দী রচনা করেছিলেন।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও পৃষ্ঠপোষকতা: মধ্যযুগে সুলতানি আমলের শাসনকর্তারা প্রায়ই বাংলা সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। ছুটিখান ছিলেন লস্কর পরাগল-খানের পুত্র, যিনি চট্টগ্রাম ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে হোসেন শাহী সুলতানদের প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন। তাঁর পিতা পরাগল-খান যেমন কবীন্দ্র পরমেশ্বরকে দিয়ে মহাভারতের অনুবাদ করিয়েছিলেন, তেমনি ছুটিখানও বাংলা সাহিত্যের প্রসারে উৎসাহিত ছিলেন এবং সেই ধারাবাহিকতায় তিনি শ্রীকর নন্দীকে মহাভারতের অশ্বমেধ পর্ব অনুবাদের দায়িত্ব দেন। তাঁর নামানুসারেই এই কাব্যগ্রন্থটি ‘ছুটিখানী মহাভারত’ নামে পরিচিতি পায়।
বিষয়বস্তু ও কাব্যশৈলী: মহাভারতের অশ্বমেধ পর্বে পাণ্ডবদের অশ্বমেধ যজ্ঞ এবং অর্জুনের বিভিন্ন রাজ্য জয়ের কাহিনী বর্ণিত হয়েছে। শ্রীকর নন্দী তাঁর কাব্যে এই মূল কাহিনীর পাশাপাশি মধ্যযুগীয় বাংলার সমাজচিত্র, আচার-অনুষ্ঠান এবং জনজীবনের ছাপ ফুটিয়ে তুলেছেন। তাঁর অনুবাদশৈলী ছিল অত্যন্ত সাবলীল এবং হৃদয়গ্রাহী, যা সাধারণ মানুষের কাছে মহাভারতের কাহিনীকে অত্যন্ত সহজবোধ্য করে তুলেছিল। লৌকিক ভাষার ব্যবহারের কারণে এই কাব্যটি তৎকালীন পাঠকদের কাছে বিশেষভাবে সমাদৃত হয়েছিল।
বাংলা সাহিত্যে গুরুত্ব:
- সাহিত্যের প্রসার: সুলতানি আমলের স্থানীয় প্রশাসকদের পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলা ভাষা যে রাজকীয় এবং সামাজিক মর্যাদা পাচ্ছিল, ‘ছুটিখানী মহাভারত’ তার অন্যতম শ্রেষ্ঠ উদাহরণ।
- ভৌগোলিক গুরুত্ব: এই কাব্যের মাধ্যমে আমরা সেই সময়ের চট্টগ্রাম অঞ্চলের ভৌগোলিক অবস্থান এবং শাসনব্যবস্থা সম্পর্কে কিছু ধারণা পাই।
- ভাষাতাত্ত্বিক অবদান: মধ্যযুগের বাংলা ভাষার বিবর্তন এবং শব্দভাণ্ডারের উন্নয়নে এই গ্রন্থের অবদান অপরিসীম।
মূল্যায়ন: ‘ছুটিখানী মহাভারত’ কেবল একটি অনুবাদ গ্রন্থ নয়, বরং এটি একটি সৃজনশীল সাহিত্যকর্ম। কবি শ্রীকর নন্দী তাঁর মৌলিক প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে কাহিনীতে নাটকীয়তা ও আবেগ সঞ্চার করতে সক্ষম হয়েছিলেন। পরাগল-খানের পৃষ্ঠপোষকতায় রচিত ‘পরালী মহাভারত’ এবং ছুটিখানের পৃষ্ঠপোষকতায় রচিত ‘ছুটিখানী মহাভারত’ এই দুটি গ্রন্থই মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যকে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছিল। আজও বাংলা সাহিত্যের গবেষক ও পাঠকদের কাছে এই কাব্যটি অত্যন্ত মূল্যবান একটি দলিল হিসেবে বিবেচিত হয়।