ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে ‘যুগসন্ধির কবি’ বা যুগসন্ধিক্ষণের কবি হিসেবে সর্বজনস্বীকৃত। মধ্যযুগের দেবনির্ভর সাহিত্য থেকে আধুনিক যুগের মানবকেন্দ্রিক সাহিত্যে উত্তরণের ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা ছিল একটি মজবুত সেতুর মতো। একাধারে তিনি ছিলেন প্রথিতযশা কবি, তীক্ষ্ণ সমাজ সমালোচক এবং দূরদর্শী সাংবাদিক।
জন্ম ও প্রারম্ভিক জীবন
-
জন্ম: ১৮১২ খ্রিষ্টাব্দের ৬ মার্চ (১২১৮ বঙ্গাব্দের ২৫ ফাল্গুন) তিনি পশ্চিমবঙ্গের উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার কাঞ্চনপল্লী বা বর্তমান কাঁচড়াপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন।
-
পরিবার ও শিক্ষা: তাঁর পিতা হরিনারায়ণ গুপ্ত ছিলেন একজন আয়ুর্বেদ চিকিৎসক। শৈশবেই মাতৃবিয়োগের পর তিনি কলকাতায় মামাবাড়িতে চলে আসেন। প্রথাগত বিদ্যালয়ের শিক্ষায় তিনি খুব একটা মনযোগী না হলেও, নিজস্ব মেধা ও চেষ্টায় তিনি বাংলা, সংস্কৃত ও ইংরেজি ভাষায় গভীর পাণ্ডিত্য অর্জন করেছিলেন।
সাংবাদিকতা ও সম্পাদনা
-
সংবাদ প্রভাকর: ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কীর্তি হলো ১৮৩১ খ্রিষ্টাব্দে ধনাঢ্য যোগীন্দ্রমোহন ঠাকুরের সহায়তায় ‘সংবাদ প্রভাকর’ প্রকাশ। এটি পরবর্তীতে বাংলা ভাষার প্রথম দৈনিক পত্রিকায় রূপান্তরিত হয় এবং সমকালীন সমাজের দর্পণ হয়ে ওঠে।
-
অন্যান্য পত্রিকা: সংবাদ প্রভাকর ছাড়াও তিনি বিভিন্ন সময়ে ‘সংবাদ রত্নাবলী’, ‘পাষণ্ড পীড়ন’ এবং ‘সংবাদ সাধুরঞ্জন’ নামক পত্রিকা অত্যন্ত সফলভাবে সম্পাদনা করেছিলেন।
সাহিত্যিক অবদান ও বৈশিষ্ট্য
-
যুগসন্ধির কবি: তাঁর কবিতায় একদিকে যেমন মধ্যযুগের কবিগান, তরজা ও পাঁচালির প্রভাব ছিল, অন্যদিকে তেমনি ফুটে উঠেছিল আধুনিক যুগের বাস্তবতাবোধ, সমাজচেতনা ও স্বদেশপ্রেম। দুই ভিন্ন যুগের এই অপূর্ব মেলবন্ধন ঘটানোর কারণেই তাঁকে ‘যুগসন্ধির কবি’ আখ্যা দেওয়া হয়।
-
স্বদেশপ্রেম ও ব্যঙ্গবিদ্রূপ: তাঁর কবিতায় গভীর দেশপ্রেম ও মাতৃভাষার প্রতি অগাধ ভালোবাসার প্রকাশ ঘটেছিল। অন্ধভাবে পাশ্চাত্য অনুকরণকারী নব্য বাবু সম্প্রদায় এবং মেকি আধুনিকতাকে তিনি তাঁর শাণিত ব্যঙ্গবিদ্রূপের মাধ্যমে তীব্র আক্রমণ করতেন।
-
নতুন প্রতিভার বিকাশ: বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, দীনবন্ধু মিত্র এবং রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ভবিষ্যৎ দিকপালদের সাহিত্যচর্চার হাতেখড়ি হয়েছিল ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের উৎসাহে। তিনি তাঁর পত্রিকায় নবীনদের লেখা ছাপিয়ে তাঁদের সাহিত্যের পথে আসার পথ সুগম করেছিলেন।
বিলুপ্তপ্রায় সাহিত্যের পুনরুদ্ধার
বাংলা সাহিত্যের প্রতি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের আরেকটি বিশাল অবদান হলো প্রাচীন সাহিত্যের পুনরুদ্ধার। ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর, রামপ্রসাদ সেন, রামনিধি গুপ্ত (নিধুবাবু), হরু ঠাকুর প্রমুখ প্রাচীন ও মধ্যযুগের কবিওয়ালাদের বিলুপ্তপ্রায় সাহিত্যকর্ম, গান ও জীবনী তিনি গ্রাম-গঞ্জে ঘুরে অত্যন্ত পরিশ্রম করে সংগ্রহ করেছিলেন। তাঁর এই উদ্যোগ না থাকলে বাংলার অমূল্য লোকজ সাহিত্যের বিশাল এক ভাণ্ডার চিরতরে হারিয়ে যেত।
মৃত্যু: ১৮৫৯ খ্রিষ্টাব্দের ২৩ জানুয়ারি (১০ মাঘ ১২৬৫ বঙ্গাব্দ) মাত্র ৪৬ বছর বয়সে এই বরেণ্য কবি ও সাহিত্য-উদ্যোক্তা শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।