উনিশ শতকের বাংলার সমাজ, সাহিত্য ও সাংবাদিকতার ইতিহাসে ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত সম্পাদিত ‘সংবাদ প্রভাকর’ একটি অবিস্মরণীয় নাম। এটি কেবল একটি সংবাদপত্র ছিল না, বরং সমকালীন সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবীদের একটি অন্যতম প্রধান মিলনকেন্দ্র ছিল।
প্রকাশনার ইতিহাস
-
প্রতিষ্ঠা ও পৃষ্ঠপোষকতা: ১২৩৭ বঙ্গাব্দের ১৬ই মাঘ (২৮ জানুয়ারি ১৮৩১ খ্রিষ্টাব্দ) পত্রিকাটির প্রথম প্রকাশ ঘটে। পাথুরিয়াঘাটার ধনাঢ্য ও সাহিত্যানুরাগী যোগীন্দ্রমোহন ঠাকুরের আর্থিক আনুকূল্যে ও প্রেরণায় কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত এটি প্রকাশ করেন।
-
প্রথম দৈনিক পত্রিকা: প্রথমদিকে এটি সাপ্তাহিক পত্রিকা হিসেবে প্রকাশিত হতো। মাঝে কিছুদিন প্রকাশনা বন্ধ থাকার পর ১২৪৩ বঙ্গাব্দের ২৭শে শ্রাবণ থেকে এটি সপ্তাহে তিনদিন প্রকাশিত হতে শুরু করে। পরবর্তীতে ১২৪৬ বঙ্গাব্দের ১লা আষাঢ় (১৪ জুন ১৮৩৯ খ্রিষ্টাব্দ) থেকে এটি দৈনিক পত্রিকা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। ঐতিহাসিকভাবে ‘সংবাদ প্রভাকর’ হলো বাংলা ভাষার প্রথম দৈনিক সংবাদপত্র।
বাংলা সাহিত্যে অসামান্য অবদান
-
নতুন প্রতিভার উন্মেষ: আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অনেক দিকপালের সাহিত্যিক জীবনের হাতেখড়ি হয়েছিল এই পত্রিকার মাধ্যমে। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, দীনবন্ধু মিত্র, রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায়, মনোমোহন বসুর মতো প্রখ্যাত সাহিত্যিকদের প্রথম দিকের অনেক রচনা এই পত্রিকাতেই প্রকাশিত হয়েছিল। ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত নবীন লেখকদের প্রবল উৎসাহ দিতেন এবং তাঁদের রচনা নিপুণভাবে সংশোধন করে ছাপাতেন।
-
প্রাচীন ও নবীনের সেতুবন্ধন: ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত নিজে ছিলেন যুগসন্ধিক্ষণের কবি। তাঁর সম্পাদিত এই পত্রিকায় একদিকে যেমন মধ্যযুগীয় ধারার কবিতা, ঈশ্বর গুপ্তের নিজস্ব ব্যঙ্গ ও সমসাময়িক ঘটনাবলি নিয়ে পদ্য স্থান পেত, অন্যদিকে আধুনিক পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত তরুণদের মননশীল গদ্য ও প্রবন্ধও সমান গুরুত্বের সাথে ছাপা হতো।
-
লুপ্তপ্রায় সাহিত্যের পুনরুদ্ধার: রামপ্রসাদ সেন, ভারতচন্দ্র রায়গুণাকরসহ রামনিধি গুপ্ত (নিধুবাবু), হরু ঠাকুর প্রমুখ কবিওয়ালাদের বিলুপ্তপ্রায় গান ও জীবনবৃত্তান্ত অনেক পরিশ্রম করে সংগ্রহ করে প্রকাশ করার ক্ষেত্রে এই পত্রিকার অবদান অসামান্য।
সমাজ ও ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি
পত্রিকাটি মূলত রক্ষণশীল হিন্দু সমাজের মুখপাত্র হিসেবে কাজ করলেও শিক্ষা বিস্তার, নারী শিক্ষা এবং সামাজিক নানা উন্নয়নের ক্ষেত্রে এর যথেষ্ট ইতিবাচক ভূমিকা ছিল। ধর্মীয় ক্ষেত্রে এটি হিন্দু ধর্মের পক্ষে জোরালো অবস্থান নিত এবং মিশনারিদের ধর্মান্তরকরণ প্রক্রিয়ার তীব্র সমালোচনা করত।
বাংলা সংবাদপত্র এবং আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনে ‘সংবাদ প্রভাকর’ ও এর সুযোগ্য সম্পাদক ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের ঐতিহাসিক ভূমিকা চিরস্মরণীয় হয়ে আছে।