জাকাত হলো ইসলামের পাঁচটি মূল স্তম্ভের মধ্যে তৃতীয়। আরবি ‘জাকাত’ শব্দের অর্থ পবিত্রতা, বৃদ্ধি বা বিকাশ। ইসলামের পরিভাষায়, নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হলে, বছরের একটি নির্দিষ্ট অংশ শরিয়ত নির্ধারিত খাতগুলোতে ব্যয় করাকে জাকাত বলা হয়। জাকাত প্রদানের মাধ্যমে মানুষের সম্পদ পবিত্র হয় এবং দরিদ্রের হক আদায়ের ফলে সমাজে সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত হয়।
জাকাত ফরজ হওয়ার শর্তাবলি
একজন মুসলিমের ওপর জাকাত ফরজ হওয়ার জন্য কয়েকটি শর্ত পূরণ হতে হয়:
১. ইসলাম ধর্ম: জাকাত কেবল মুসলিমদের ওপর ফরজ।
২. স্বাধীন ও প্রাপ্তবয়স্ক: জাকাতদাতাকে স্বাধীন ও প্রাপ্তবয়স্ক হতে হবে।
৩. নিসাব পরিমাণ সম্পদ: সম্পদের পরিমাণ একটি নির্দিষ্ট পর্যায় বা সীমা অতিক্রম করতে হবে, যাকে ‘নিসাব’ বলা হয়।
৪. সম্পদের ওপর এক বছর অতিক্রান্ত: নিসাব পরিমাণ সম্পদের ওপর পূর্ণ এক চান্দ্রবছর অতিবাহিত হতে হবে।
৫. ঋণমুক্ত হওয়া: মৌলিক প্রয়োজন বা ঋণের অতিরিক্ত সম্পদ থাকতে হবে।
নিসাব ও হার
সাধারণত নিসাব হলো সাড়ে সাত তোলা স্বর্ণ (৮৭.৪৫ গ্রাম) অথবা সাড়ে বায়ান্ন তোলা রৌপ্য (৬১২.৩৬ গ্রাম) বা এর সমমূল্যের নগদ অর্থ বা বাণিজ্যপণ্য। নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হলে মোট সম্পদের ২.৫% (বা ৪০ ভাগের ১ ভাগ) জাকাত হিসেবে প্রদান করতে হয়।
জাকাত প্রদানের খাতসমূহ
পবিত্র কুরআনের সূরা আত-তওবার ৬০ নম্বর আয়াতে জাকাত ব্যয়ের ৮টি খাতের কথা উল্লেখ করা হয়েছে:
১. ফকির: যাদের সম্পদ নেই বা খুব সামান্য আছে।
২. মিসকিন: যারা অভাবী কিন্তু লজ্জায় কারো কাছে হাত পাতে না।
৩. জাকাত আদায়কারী: যারা সরকারিভাবে জাকাত আদায়ের কাজে নিযুক্ত।
৪. নওমুসলিম: ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করতে বা নতুন মুসলিমদের সহযোগিতার জন্য।
৫. দাস মুক্তি: বন্দি বা দাস মুক্ত করার কাজে।
৬. ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি: ঋণ পরিশোধে অক্ষম ব্যক্তি।
৭. আল্লাহর রাস্তায়: জিহাদ বা আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠার কাজে।
৮. মুসাফির: বিপদে পড়া বা অভাবগ্রস্ত পথিক।
জাকাতের গুরুত্ব ও সামাজিক প্রভাব
জাকাত কেবল একটি ধর্মীয় ইবাদত নয়, এটি একটি শক্তিশালী আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থা। এর গুরুত্ব নিম্নরূপ:
-
দারিদ্র্য বিমোচন: জাকাতের সম্পদ দরিদ্র মানুষের হাতে পৌঁছালে সমাজের অসহায় মানুষ অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা অর্জন করতে পারে।
-
সম্পদের সুষম বণ্টন: এটি ধনী-দরিদ্রের মধ্যকার ব্যবধান কমায় এবং সমাজে সম্পদের কেন্দ্রীকরণ রোধ করে।
-
আত্মশুদ্ধি: জাকাত প্রদানের মাধ্যমে মানুষের অন্তরের লোভ-লালসা ও কার্পণ্য দূর হয় এবং সে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করে।
-
অর্থনৈতিক গতিশীলতা: জাকাতের অর্থ যখন দরিদ্রদের হাতে যায়, তখন তাদের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়, যা সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে অবদান রাখে।
জাকাত একটি গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক ইবাদত যা সঠিকভাবে পালন করলে ব্যক্তি ও সমাজ উভয়ই উপকৃত হয়।