অভয়নগর উপজেলা

পরিচিতি ও অবস্থান

অভয়নগর বাংলাদেশের খুলনা বিভাগের যশোর জেলার অন্তর্গত একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এবং শিল্পসমৃদ্ধ উপজেলা। এটি যশোর জেলার দক্ষিণ-পূর্বাংশে অবস্থিত। স্থানীয়ভাবে এবং প্রশাসনিক ক্ষেত্রে এর প্রাণকেন্দ্রটি ‘নওয়াপাড়া’ নামেই সর্বাধিক পরিচিত। এই উপজেলার উত্তরে যশোর সদর ও নড়াইল সদর, দক্ষিণে খুলনার খানজাহান আলী থানা, ডুমুরিয়া ও ফুলতলা, পূর্বে নড়াইল সদর ও কালিয়া এবং পশ্চিমে মণিরামপুর উপজেলা অবস্থিত। এর আয়তন প্রায় ২৪৭.২১ বর্গ কিলোমিটার এবং ভৈরব ও চিত্রা নদীর মতো গুরুত্বপূর্ণ নদ-নদী এর ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে।

নামকরণের ইতিহাস

অভয়নগর উপজেলার নামকরণের সাথে এক ঐতিহাসিক রাজকীয় বিষাদগাথা জড়িয়ে আছে। কিংবদন্তি অনুযায়ী, যশোরের প্রতাপশালী রাজা প্রতাপাদিত্যের পতন ও বন্দিদশার পর তাঁর বংশধর নীলকণ্ঠ রায় ভৈরব নদের তীরে এসে আশ্রয় নেন। সেখানে তাঁর ঘরে জন্ম নেয় এক রাজকন্যা, যাঁর নাম রাখা হয় ‘অভয়া’। রাজকন্যা অভয়ার বিয়ে হয় নড়াইলের এক জমিদারের পুত্র নীলাম্বর রায়ের সাথে। কিন্তু দুরারোগ্য ব্যাধিতে স্বামীর অকালমৃত্যুর পর হিন্দু প্রথা অনুসারে বাল্যবিধবা অভয়া তাঁর বাকি জীবনটা পূজা-অর্চনা করে কাটানোর সিদ্ধান্ত নেন। তাঁর অনুরোধে রাজা নীলকণ্ঠ রায় ১৭৪৫ থেকে ১৭৬৪ সালের মধ্যে ভৈরব নদের তীরে ১১টি সুদৃশ্য শিব মন্দির (যা বর্তমানে ‘এগারো শিব মন্দির’ নামে পরিচিত) নির্মাণ করেন। এই রাজকন্যা অভয়ার নামানুসারেই এই অঞ্চলের নামকরণ করা হয় ‘অভয়নগর’।

প্রশাসনিক কাঠামো

১৮৭৫ সালের ১৬ মার্চ ব্রিটিশ শাসনামলে অভয়নগর থানা প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ১৯৮২ সালের ১ আগস্ট এটিকে উপজেলায় উন্নীত করা হয়। বর্তমানে এই উপজেলাটি ১টি পৌরসভা (নওয়াপাড়া পৌরসভা) এবং ৮টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত। ইউনিয়নগুলো হলো: চলিশিয়া, পায়রা, প্রেমবাগ, বাঘুটিয়া, শুভপাড়া, শ্রীধরপুর, সিদ্ধিপাশা এবং সুন্দলী। ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী এখানকার জনসংখ্যা প্রায় ২,৬২,৪৩৪ জন।

অর্থনীতি ও শিল্প

অর্থনৈতিক দিক থেকে অভয়নগর বা নওয়াপাড়া সারা বাংলাদেশে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। ভৈরব নদের তীরে অবস্থিত ‘নওয়াপাড়া নদীবন্দর’ বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ এবং ব্যস্ত একটি নদীবন্দর। প্রতিদিন এই বন্দরের মাধ্যমে সার, সিমেন্ট, কয়লা, পাথর, গম ও ভুট্টাসহ শত শত কোটি টাকার পণ্য আমদানি-রপ্তানি এবং পরিবহন করা হয়। এছাড়া নওয়াপাড়া অঞ্চলে অসংখ্য ভারী ও মাঝারি শিল্পকারখানা, জুট মিল এবং টেক্সটাইল মিল গড়ে উঠেছে, যা বাংলাদেশের অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানে ব্যাপক ভূমিকা রাখছে।

ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন

অভয়নগর উপজেলায় প্রাচীনকাল থেকে মধ্যযুগের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক নিদর্শন রয়েছে:

  • এগারো শিব মন্দির: বাঘুটিয়া ইউনিয়নে ভৈরব নদের তীরে রাজা নীলকণ্ঠ রায় নির্মিত এই ১১টি শিব মন্দির প্রাচীন বাংলার হিন্দু মন্দির স্থাপত্যের এক অপূর্ব নিদর্শন।

  • সিদ্ধিপাশার রাজবাড়ি ও শ্রীধরপুর জমিদার বাড়ি: প্রাচীন আমলের জমিদার ও রাজাদের শাসনামলের স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে এই প্রাচীন স্থাপনাগুলো আজও টিকে আছে।

  • খানজাহান আলী জামে মসজিদ (শুভপাড়া) ও দিঘি: এই উপজেলায় সুলতানি আমলের বিখ্যাত সাধক খানজাহান আলীর স্মৃতিবিজড়িত মসজিদ এবং বাসুয়াড়ীতে একটি সুপ্রাচীন দিঘি রয়েছে।

  • এছাড়া মধ্যপুরের নীলকুঠি এবং রামসরার রূপসনাতন ধাম এখানকার উল্লেখযোগ্য স্থান।

উপসংহার

প্রাচীন রাজবংশের স্মৃতিবিজড়িত ইতিহাস, অপরূপ প্রাকৃতিক জলাশয় এবং আধুনিক যুগের ক্রমবর্ধমান শিল্প ও বাণিজ্যের এক অভূতপূর্ব সমন্বয় ঘটেছে এই অভয়নগর উপজেলায়। ঐতিহাসিক প্রত্নসম্পদের পাশাপাশি নদীবন্দর কেন্দ্রিক অর্থনৈতিক কর্মচাঞ্চল্য অঞ্চলটিকে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের এক অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক কেন্দ্র বা ‘হাবে’ পরিণত করেছে।