ড. নাজমা চৌধুরী (১৯৪২, ২০২১) ছিলেন বাংলাদেশের একজন প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ, গবেষক এবং নারী অধিকার ও ক্ষমতায়ন আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ইতিহাসে তিনি প্রথম নারী হিসেবে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হওয়ার ঐতিহাসিক গৌরব অর্জন করেন। ১৯৯৬ সালে বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের নেতৃত্বে গঠিত বাংলাদেশের প্রথম সাংবিধানিক তত্ত্বাবধায়ক সরকারে তিনি উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ পান এবং নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে পালন করেন। রাষ্ট্রের একটি ক্রান্তিলগ্নে ও নির্বাচনকালীন সরকারের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তাঁর এই অন্তর্ভুক্তি বাংলাদেশের নারীদের জন্য এক অনন্য অনুপ্রেরণার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের একজন স্বনামধন্য অধ্যাপক হিসেবে ড. নাজমা চৌধুরী তাঁর সুদীর্ঘ ও বর্ণাঢ্য কর্মজীবন অতিবাহিত করেন। শিক্ষাক্ষেত্রে তাঁর সবচেয়ে যুগান্তকারী ও দূরদর্শী অবদান হলো ১৯৯৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ’ (Women and Gender Studies) বিভাগ প্রতিষ্ঠা করা। তিনি ছিলেন এই বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারপারসন। মূলত তাঁরই ঐকান্তিক মেধা ও পরিশ্রমে বাংলাদেশে প্রাতিষ্ঠানিক ও উচ্চশিক্ষার পর্যায়ে নারী অধিকার ও জেন্ডার অধ্যয়নের মতো একটি আধুনিক চিন্তাধারার বিকাশ ঘটে। বারবারা জে. নেলসনের সাথে তাঁর যৌথ সম্পাদনায় প্রকাশিত ‘উইমেন অ্যান্ড পলিটিক্স ওয়ার্ল্ডওয়াইড’ (Women and Politics Worldwide) গ্রন্থটি আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক সমাদৃত হয় এবং ১৯৯৪ সালে আমেরিকান পলিটিক্যাল সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশন কর্তৃক শ্রেষ্ঠ প্রকাশনা হিসেবে পুরস্কৃত হয়।
নারী শিক্ষা, গবেষণা এবং সামাজিক ক্ষমতায়নে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার ২০০৮ সালে তাঁকে দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘একুশে পদক’-এ ভূষিত করে। এছাড়া ২০০৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে মর্যাদাপূর্ণ ‘রোকেয়া চেয়ার’ সম্মাননায় ভূষিত করে। ২০২১ সালের ৮ আগস্ট এই মহীয়সী নারীর জীবনাবসান ঘটে। বাংলাদেশের নারীদের রাজনৈতিক অধিকার সচেতনতা বৃদ্ধি, সমাজে নারী-পুরুষের সমতা বিধান এবং একাডেমিক পরিমণ্ডলে জেন্ডার স্টাডিজকে সুপ্রতিষ্ঠিত করার সংগ্রামে ড. নাজমা চৌধুরীর নাম ও তাঁর কর্মময় জীবন ইতিহাসের পাতায় চিরকাল উজ্জ্বল হয়ে থাকবে।