ওয়ারেন হেস্টিংস

ওয়ারেন হেস্টিংস (শাসনকাল: ১৭৭২–১৭৮৫ খ্রিস্টাব্দ) ছিলেন ফোর্ট উইলিয়াম (বাংলা) প্রেসিডেন্সির প্রথম গভর্নর এবং পরবর্তীকালে ব্রিটিশ ভারতের প্রথম গভর্নর-জেনারেল। রবার্ট ক্লাইভ ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের যে বীজ বপন করেছিলেন, হেস্টিংস তাঁর প্রশাসনিক ও আইনি সংস্কারের মাধ্যমে তাকে একটি সুসংগঠিত সাম্রাজ্যের রূপ দিয়েছিলেন। তবে তাঁর শাসনকাল কেবল সংস্কার নয়, বরং চরম বিতর্ক ও দুর্নীতির অভিযোগেও কলঙ্কিত ছিল। (উৎস: ড. রমেশচন্দ্র মজুমদার, ‘ভারতের ইতিহাস’)

প্রশাসনিক ও রাজস্ব সংস্কার

১৭৭২ সালে বাংলার গভর্নর হয়ে আসার পর হেস্টিংস প্রশাসনকে ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নেন:

  • দ্বৈত শাসনের অবসান: তিনি রবার্ট ক্লাইভ প্রবর্তিত বিতর্কিত ‘দ্বৈত শাসন ব্যবস্থা’ (Dual Government) বাতিল করেন এবং বাংলার শাসন ও রাজস্ব আদায়ের সম্পূর্ণ দায়িত্ব সরাসরি ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাতে তুলে নেন।

  • রাজস্ব বোর্ড ও পাঁচশালা বন্দোবস্ত: রাজস্ব আদায়ের জন্য তিনি কলকাতায় ‘বোর্ড অফ রেভিনিউ’ (Board of Revenue) গঠন করেন। রাজস্ব আদায়কারীদের মধ্যে নিলামের ভিত্তিতে পাঁচ বছরের জন্য জমি ইজারা দেওয়ার নীতি চালু করেন, যা ‘পাঁচশালা বন্দোবস্ত’ নামে পরিচিত।

  • রাজধানী স্থানান্তর: তিনি মুর্শিদাবাদ থেকে ট্রেজারি বা রাজকোষ কলকাতায় স্থানান্তর করেন, যার ফলে কলকাতা ব্রিটিশ ভারতের কার্যত রাজধানীতে পরিণত হয়। (উৎস: বাংলাপিডিয়া)

বিচারব্যবস্থার আধুনিকায়ন

ভারতে আধুনিক বিচারব্যবস্থার প্রাথমিক ভিত্তি হেস্টিংসই স্থাপন করেছিলেন।

  • তিনি প্রতিটি জেলায় একটি করে ‘দেওয়ানি আদালত’ (সিভিল কোর্ট) এবং ‘ফৌজদারি আদালত’ (ক্রিমিনাল কোর্ট) স্থাপন করেন।

  • এগুলোর আপিল শোনার জন্য কলকাতায় সদর দেওয়ানি আদালত ও সদর নিজামত আদালত প্রতিষ্ঠা করেন। হিন্দু ও মুসলিম আইন সংকলনেরও উদ্যোগ নেন তিনি।

শিক্ষানুরাগ ও প্রাচ্যবিদ্যার পৃষ্ঠপোষকতা

ওয়ারেন হেস্টিংস প্রাচ্যবিদ্যা বা ভারতীয় ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতি প্রবল আগ্রহী ছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, ভারতীয়দের শাসন করতে হলে তাদের ঐতিহ্য ও ভাষা বুঝতে হবে:

  • কলকাতা মাদ্রাসা: ১৭৮১ সালে তিনি মুসলিম আইন ও আরবি-ফারসি শিক্ষার প্রসারের জন্য ‘কলকাতা মাদ্রাসা’ প্রতিষ্ঠা করেন।

  • এশিয়াটিক সোসাইটি: ১৭৮৪ সালে স্যার উইলিয়াম জোন্স যখন কলকাতায় ‘এশিয়াটিক সোসাইটি’ প্রতিষ্ঠা করেন, তখন হেস্টিংস তাঁর প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিলেন।

  • তিনি চার্লস উইলকিন্সকে সংস্কৃত ভাষা থেকে ‘ভগবদগীতা’-র প্রথম ইংরেজি অনুবাদ করতে সাহায্য ও উৎসাহিত করেছিলেন। (উৎস: নৃপেন্দ্রকুমার চট্টোপাধ্যায়, ‘ব্রিটিশ ভারতের ইতিহাস’)

বিতর্কিত ঘটনাবলি ও নিষ্ঠুরতা

প্রশাসক হিসেবে দক্ষ হলেও, কোম্পানির অর্থভাণ্ডার ভরতে এবং নিজের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে হেস্টিংস চরম অনৈতিক ও নিষ্ঠুর পথ অবলম্বন করেছিলেন:

  • মহারাজা নন্দকুমারের ফাঁসি (১৭৭৫): এটি তাঁর আমলের সবচেয়ে কুখ্যাত ঘটনা। নন্দকুমার হেস্টিংসের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ এনেছিলেন। প্রতিশোধ নিতে হেস্টিংস তাঁর বন্ধু ও প্রধান বিচারপতি স্যার এলাইজা ইম্পের সাথে যোগসাজশ করে একটি জালিয়াতির মামলায় নন্দকুমারকে ফাঁসি দেন। ঐতিহাসিকরা একে ‘বিচারবিভাগীয় হত্যাকাণ্ড’ (Judicial Murder) বলে আখ্যায়িত করেন।

  • অযোধ্যার বেগমদের ওপর অত্যাচার: কোম্পানির পাওনা টাকা আদায়ের নামে তিনি অযোধ্যার নবাবের মা ও দাদির (বেগমদের) ওপর নির্মম শারীরিক ও মানসিক অত্যাচার চালিয়ে তাঁদের বিপুল ধনসম্পদ লুণ্ঠন করেন।

  • রোহিলা যুদ্ধ ও চেত সিং-এর ঘটনা: অর্থের বিনিময়ে অযোধ্যার নবাবকে রোহিলাদের বিরুদ্ধে ভাড়াটে সৈন্য দিয়ে সাহায্য করা এবং বেনারসের রাজা চেত সিং-এর কাছ থেকে জোরপূর্বক বিপুল অর্থ আদায় তাঁর শাসনকালকে কালিমালিপ্ত করে। (উৎস: ড. এ.এম. চৌধুরী, ‘Dynastic History of Bengal’)

ইমপিচমেন্ট (Impeachment) বা অভিশংসন

ভারতে তাঁর এই দুর্নীতি ও নিষ্ঠুরতার খবর ইংল্যান্ডে পৌঁছালে ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয়। ১৭৮৫ সালে ইংল্যান্ডে ফিরে যাওয়ার পর ব্রিটিশ পার্লামেন্টে প্রখ্যাত বাগ্মী ও রাজনীতিক এডমান্ড বার্ক (Edmund Burke)-এর নেতৃত্বে হেস্টিংসের বিরুদ্ধে ইমপিচমেন্ট বা বিচার শুরু হয়। দীর্ঘ সাত বছর (১৭৮৮-১৭৯৫) ধরে চলা এই ঐতিহাসিক বিচারে শেষ পর্যন্ত প্রমাণের অভাবে তিনি বেকসুর খালাস পান, তবে তাঁর সম্মান ও রাজনৈতিক জীবন পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায়।

ঐতিহাসিক মূল্যায়ন

ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে ওয়ারেন হেস্টিংস এক অত্যন্ত জটিল চরিত্র। তিনি ছিলেন একাধারে সাম্রাজ্যবাদী শোষক এবং আধুনিক প্রশাসনের রূপকার। তিনি যখন ভারতে আসেন, তখন ব্রিটিশ শাসন ছিল একটি বিশৃঙ্খল বাণিজ্যিক লুণ্ঠন মাত্র। তিনি সেই বিশৃঙ্খলা দূর করে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের একটি শক্ত প্রশাসনিক, আইনি ও রাজস্ব কাঠামো দাঁড় করিয়েছিলেন। তবে এই কাঠামো তৈরি করতে গিয়ে তিনি যে নিষ্ঠুরতা ও দুর্নীতির আশ্রয় নিয়েছিলেন, তা তাঁকে ইতিহাসের কাঠগড়ায় চিরস্থায়ী অপরাধীর আসনেই বসিয়ে রেখেছে।