হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত (জন্ম: ১৭ মে, ১৯৭৩) হলেন সমসাময়িক বাংলা সাহিত্যের একজন অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং সুপরিচিত লেখক। বিশেষ করে শিশু-কিশোরদের জন্য লেখা অ্যাডভেঞ্চার, রহস্য-রোমাঞ্চ এবং প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য রচিত ঐতিহাসিক উপন্যাস ও ডার্ক ফ্যান্টাসির (Dark Fantasy) জন্য তিনি বর্তমান প্রজন্মের পাঠক মহলে দারুণ সমাদৃত।
জন্ম ও শিক্ষাজীবন
হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগনা জেলার কাঁচড়াপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাস বিষয়ে স্নাতকোত্তর (এম.এ.) সম্পন্ন করেন। ইতিহাসের ছাত্র হওয়ার কারণে তাঁর লেখায় ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও রহস্যের এক চমৎকার মেলবন্ধন দেখা যায়। লেখালেখির প্রতি তাঁর অদম্য আকর্ষণের কারণে তিনি একসময় তাঁর নিশ্চিত সরকারি চাকরি ছেড়ে দিয়ে পুরোপুরি পেশাদার লেখক হিসেবে আত্মনিয়োগ করেন।
সাহিত্যকর্ম ও বহুমুখী লেখনী
হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত ছোটদের এবং বড়দের—উভয় শ্রেণির পাঠকের জন্যই নিয়মিত লিখে চলেছেন। তাঁর লেখনীর প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো টানটান উত্তেজনা, সাবলীল ভাষা এবং নিখুঁত ঐতিহাসিক বা ভৌগোলিক বুনন।
-
অ্যাডভেঞ্চার ও কিশোর সাহিত্য: কিশোর পাঠকদের কাছে তাঁর অ্যাডভেঞ্চার সিরিজগুলো অত্যন্ত জনপ্রিয়। তাঁর বিখ্যাত কিশোর উপন্যাস ও গল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে— ‘কালো ঘুড়ি’, ‘রুদ্রনাথের চুনির চোখ’, ‘রানি হাটশেপসুটের মমি’, ‘সূর্যমন্দিরের শেষ প্রহরী’, ‘যক্ষ সম্পাত’, এবং ‘সুন্দা দ্বীপের সোনার ড্রাগন’।
-
ঐতিহাসিক ও ডার্ক ফ্যান্টাসি: প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য তিনি বেশ কিছু দুর্দান্ত ঐতিহাসিক থ্রিলার এবং ডার্ক ফ্যান্টাসি রচনা করেছেন। এর মধ্যে ‘লাল রক্ত কালো গোলাপ’, ‘বন্দর সুন্দরী’, এবং ‘জীবন্ত উপবীত’ (যা একটি ভয়ংকর ও অদ্ভুত ডার্ক ফ্যান্টাসি সংকলন) বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
বেতার ও শ্রুতিনাটকে জনপ্রিয়তা
হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্তের গল্প ও উপন্যাসগুলোর টানটান প্লটের কারণে এগুলো অডিও মাধ্যমের জন্য দারুণ উপযোগী। তাঁর লেখা বহু গল্প অবলম্বনে নাট্যরূপ তৈরি হয়ে তা কলকাতার জনপ্রিয় এফএম রেডিও চ্যানেলগুলোতে (যেমন: সানডে সাসপেন্স বা অনুরূপ অনুষ্ঠানে) নিয়মিত সম্প্রচারিত হয়, যা তাঁকে অগণিত শ্রোতার কাছে আরও বেশি জনপ্রিয় করে তুলেছে। এছাড়া তাঁর বেশ কিছু লেখা অন্যান্য ভাষাতেও অনূদিত হয়েছে।
স্বীকৃতি ও পুরস্কার
বাংলা সাহিত্যে, বিশেষ করে শিশু-কিশোর সাহিত্যে তাঁর অসামান্য অবদানের জন্য তিনি বেশ কিছু মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন:
-
উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী পুরস্কার: ২০১৬ সালে তাঁর লেখা ‘কালো ঘুড়ি’ বইটির জন্য পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ‘শিশু কিশোর অ্যাকাডেমি’ তাঁকে এই সম্মাননায় ভূষিত করে।
-
দীনেশচন্দ্র স্মৃতি পুরস্কার * ভারত সরকারের ইস্টার্ন জোনাল কালচারাল সেন্টারের পুরস্কার।
-
এছাড়া ‘শৈলজানন্দ পুরস্কার’-এর মতো বেশ কিছু বেসরকারি সম্মাননাও তিনি লাভ করেছেন।
উপসংহারে বলা যায়, হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত হলেন বর্তমান বাংলা রহস্য ও অ্যাডভেঞ্চার সাহিত্যের অন্যতম কান্ডারি। ডিজিটাল যুগে যখন কিশোরদের বই পড়ার অভ্যাস কমে আসছে, তখন তাঁর লেখা রোমাঞ্চকর বইগুলো নতুন প্রজন্মের পাঠকদের বইয়ের পাতায় ফিরিয়ে আনতে জাদুর মতো কাজ করছে।