চিত্রা দেব

চিত্রা দেব (২৪ নভেম্বর, ১৯৪৩ – ২ নভেম্বর, ২০১৭) ছিলেন বাংলা সাহিত্যের একজন প্রখ্যাত গবেষক, সাহিত্যিক, অনুবাদক এবং সম্পাদক। বিশেষ করে জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির নারীদের জীবন, অন্তপুরের ইতিহাস এবং সমাজ সংস্কারে তাঁদের অবদান নিয়ে তাঁর মৌলিক ও সুগভীর গবেষণামূলক কাজ বাংলা সাহিত্যে এক আকর গ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত হয়। তিনি প্রায় তিন দশক ধরে ঐতিহ্যবাহী প্রকাশনা সংস্থা ‘আনন্দ পাবলিশার্স’-এর প্রধান সম্পাদনা কর্মকর্তা হিসেবে যুক্ত ছিলেন। (উৎস: সংসদ বাঙালি চরিতাভিধান)

জন্ম ও শিক্ষাজীবন

চিত্রা দেব ১৯৪৩ সালের ২৪ নভেম্বর ভারতের বিহারের পূর্ণিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর আদি পৈতৃক নিবাস ছিল বর্তমান বাংলাদেশের যশোর জেলায়। তিনি কলকাতার প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী বেথুন কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন এবং পরবর্তীতে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর (এম.এ.) সম্পন্ন করেন। পরবর্তীতে তিনি ডক্টরেট (পিএইচ.ডি.) ডিগ্রি লাভ করেন। তাঁর গবেষণার মূল বিষয়বস্তু ছিল মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্য এবং বাংলার সামাজিক ইতিহাস। (উৎস: আনন্দবাজার পত্রিকা আর্কাইভ)

ঠাকুরবাড়ির অন্দরের ইতিহাস ও গবেষণা

চিত্রা দেবের সাহিত্যিক জীবনের সবচেয়ে বড় এবং কালজয়ী কীর্তি হলো ঠাকুরবাড়ির নারীদের নিয়ে তাঁর ধারাবাহিক গবেষণা। তিনি অবগুণ্ঠিতা অন্তপুরের নারীদের ডায়েরি, চিঠিপত্র এবং সমসাময়িক দলিল দস্তাবেজ ঘেঁটে তাঁদের সাহিত্য, শিল্প ও সমাজ সংস্কারের অবদানকে জনসমক্ষে নিয়ে আসেন।

  • ‘ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহল’: এটি তাঁর সবচেয়ে জনপ্রিয় ও পাঠকপ্রিয় গ্রন্থ। এই বইটিতে তিনি প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর থেকে শুরু করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সময় পর্যন্ত জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির অন্দরের নারীদের প্রাত্যহিক জীবন, তাঁদের শিক্ষা, মানসিক সংকট এবং বাঙালি সংস্কৃতির বিকাশে তাঁদের ভূমিকার এক জীবন্ত দলিল তুলে ধরেছেন।

  • অন্যান্য উল্লেখযোগ্য গবেষণা: তাঁর অন্যান্য বিখ্যাত গবেষণামূলক বইয়ের মধ্যে রয়েছে ‘ঠাকুরবাড়ির বাহিরমহল’, ‘অন্তপুরের আত্মকথা’, ‘মহিলা ডাক্তার: সেকালের এক সংগ্রামের ইতিহাস’, এবং ‘বিবাহবাসরের কাব্য’। (উৎস: বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস)

শিশুসাহিত্য ও অনুবাদে অবদান

গবেষণার পাশাপাশি শিশু ও কিশোরদের মনস্তত্ত্ব নিয়েও তিনি চমৎকার কিছু কাজ করেছেন। ছোটদের জন্য তিনি যেমন রূপকথা ও উপকথা লিখেছেন, তেমনি ইতিহাসকেও সহজ ভাষায় পরিবেশন করেছেন।

  • কিশোর সাহিত্য: তাঁর লেখা ‘অদ্ভুত যত গল্প’, ‘বুদ্ধিমানের পুরস্কার’, এবং ‘ইতিহাসের গল্প’ কিশোর পাঠকদের কাছে বেশ সমাদৃত।

  • অনুবাদ ও রূপান্তর: বিশ্বসাহিত্যের বেশ কিছু ধ্রুপদী গল্প ও উপন্যাস তিনি সহজ বাংলায় রূপান্তর করেছিলেন। এছাড়া বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের জটিল কিছু রচনার পাঠোদ্ধার ও সম্পাদনাতেও তাঁর বিশেষ ভূমিকা ছিল। (উৎস: রকমারি বই পরিচিতি)

আনন্দ পাবলিশার্স ও সম্পাদনা জীবন

চিত্রা দেবের কর্মজীবনের একটি বড় অংশ কেটেছে ‘আনন্দ পাবলিশার্স’-এ। একজন দক্ষ ও দূরদর্শী সম্পাদক হিসেবে তিনি বহু নতুন লেখকের লেখা পরিমার্জন ও পরিশীলিত করেছেন। তাঁর হাত ধরে বাংলা প্রকাশনা জগতে বহু কালজয়ী গ্রন্থ আলোর মুখ দেখেছে। আনন্দ পাবলিশার্সের জনপ্রিয় পূজাবার্ষিকী ও বিভিন্ন সংকলন সম্পাদনায় তাঁর সূক্ষ্ম দৃষ্টি ও সাহিত্যবোধের গভীর ছাপ ছিল। (উৎস: পত্রভারতী শতবর্ষ স্মারক)

স্বীকৃতি ও পুরস্কার

বাংলা সাহিত্যে এবং গবেষণায় অসামান্য অবদানের জন্য তিনি বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:

  • ভুবনমোহিনী দাসী স্বর্ণপদক (কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়)

  • শরৎস্মৃতি পুরস্কার

২০১৭ সালের ২ নভেম্বর কলকাতায় এই প্রাজ্ঞ গবেষক ও সাহিত্যিক শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

উপসংহারে বলা যায়, চিত্রা দেব ছিলেন বাংলার সামাজিক ইতিহাসের একজন নিষ্ঠাবান খননকারী। ইতিহাস যখন কেবল পুরুষ রাজাদের যুদ্ধবিগ্রহের গল্প বলতে ব্যস্ত ছিল, তখন চিত্রা দেব পর্দার আড়ালে থাকা নারীদের কণ্ঠস্বরকে ইতিহাসের পাতায় স্থায়ী রূপ দিয়েছিলেন। তাঁর সহজ, প্রাঞ্জল অথচ তথ্যবহুল লিখনশৈলী আজও গবেষক এবং সাধারণ পাঠক উভয়কেই সমভাবে আকর্ষণ করে। (উৎস: সংসদ বাঙালি চরিতাভিধান)