আলীবর্দী খান (শাসনকাল: ১৭৪০–১৭৫৬ খ্রিস্টাব্দ) ছিলেন বাংলার নবাবী আমলের একজন অত্যন্ত সুদক্ষ, সাহসী এবং দূরদর্শী শাসক। তিনি বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার নবাব হিসেবে তাঁর শাসনামলে রাজ্যকে বাইরের আক্রমণ থেকে রক্ষা করতে এবং অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে অবিরাম লড়াই করেছিলেন। তাঁর শাসনকালকে বাংলার স্বাধীন নবাবী আমলের অন্যতম সংকটপূর্ণ এবং একই সঙ্গে বীরত্বপূর্ণ সময় হিসেবে গণ্য করা হয়। (উৎস: ড. আবদুল করিম, ‘বাংলার ইতিহাস: মুঘল আমল’)
ক্ষমতালাভ ও পটভূমি
আলীবর্দী খানের আদি নাম ছিল মির্জা মুহাম্মদ আলী। তিনি মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেবের শাসনামলে ভারতে আসেন। তাঁর ভাই হাজী আহমদ এবং তিনি বাংলার তৎকালীন নবাব সুজাউদ্দিন খানের দরবারে অত্যন্ত প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন। ১৭১৭ সালে নবাব সরফরাজ খানকে (সুজাউদ্দিনের পুত্র) গিরিয়ার যুদ্ধে পরাজিত করে ১৭৪০ সালে তিনি বাংলার সিংহাসন দখল করেন। মোগল সম্রাট মুহাম্মদ শাহ তাঁকে ‘মুহতাসিম-উল-মুলক’ এবং ‘আলীবর্দী খান’ উপাধি দিয়ে বাংলার নবাব হিসেবে স্বীকৃতি দেন। (উৎস: বাংলাপিডিয়া)
বর্গী আক্রমণ ও সংগ্রাম
আলীবর্দী খানের শাসনামল ছিল মূলত বর্গী আক্রমণের বিরুদ্ধে দীর্ঘস্থায়ী সংগ্রামের ইতিহাস। মারাঠা সৈন্যরা (যাদের বাংলায় বর্গী বলা হতো) ১৭৪২ সাল থেকে প্রায় দশ বছর ধরে বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে ব্যাপক লুটতরাজ ও অত্যাচার চালিয়েছিল।
-
সংগ্রামের ভয়াবহতা: বর্গীরা বাংলার মানুষের জীবনে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি করেছিল। তারা ফসলের মাঠ ধ্বংস করত এবং ধনসম্পদ লুট করে নিয়ে যেত।
-
সফল প্রতিরক্ষা: আলীবর্দী খান অত্যন্ত ধৈর্য ও বীরত্বের সাথে এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করেন। শেষ পর্যন্ত ১৭৫১ সালে এক চুক্তির মাধ্যমে তিনি মারাঠাদের বার্ষিক ১২ লক্ষ টাকা ‘চৌথ’ (কর) প্রদানের বিনিময়ে বর্গী আক্রমণের অবসান ঘটান। (উৎস: ড. রমেশচন্দ্র মজুমদার, ‘বাংলাদেশের ইতিহাস: মুঘল আমল’)
প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক সংস্কার
বর্গী আক্রমণের মতো ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যেও আলীবর্দী খান প্রশাসনিক সংস্কারে মনোযোগ দিয়েছিলেন:
-
কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ: তিনি রাজ্যের আমীর-ওমরাহ ও জমিদারদের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছিলেন, যাতে রাজ্য অখণ্ড থাকে।
-
বাণিজ্যিক নিরাপত্তা: ইউরোপীয় বণিক গোষ্ঠীগুলোর (ইংরেজ, ফরাসি ও ওলন্দাজ) কর্মকাণ্ডের ওপর তিনি সতর্ক দৃষ্টি রাখতেন। যদিও তিনি বাণিজ্যের অনুমতি দিয়েছিলেন, কিন্তু তাদের রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে তিনি সব সময় সন্দেহের চোখে দেখতেন।
-
সামরিক আধুনিকায়ন: তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, মারাঠা এবং ইউরোপীয় শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করতে হলে সামরিক বাহিনীকে আরও আধুনিক ও শক্তিশালী করতে হবে। (উৎস: ড. এ.এম. চৌধুরী, ‘Dynastic History of Bengal’)
অসাম্প্রদায়িক আদর্শ
আলীবর্দী খান ছিলেন অত্যন্ত ধর্মনিরপেক্ষ এবং উদার মানসিকতার মানুষ। তাঁর রাজদরবারের প্রধান পরামর্শদাতাদের মধ্যে হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের জ্ঞানী ব্যক্তিরা ছিলেন। তিনি কখনোই ধর্মের ভিত্তিতে প্রজা শাসন করেননি। তাঁর এই অসাম্প্রদায়িক মানসিকতা ও পরমতসহিষ্ণুতা তাঁকে সাধারণ মানুষের কাছে অত্যন্ত গ্রহণযোগ্য করে তুলেছিল। তাঁর শাসনামলে বাংলায় হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতির এক চমৎকার পরিবেশ বজায় ছিল। (উৎস: ড. আবদুল করিম, ‘বাংলার ইতিহাস: মুঘল আমল’)
ঐতিহাসিক মূল্যায়ন ও উত্তরাধিকার
আলীবর্দী খানের মৃত্যু হয় ১৭৫৬ সালে। তাঁর প্রিয় দৌহিত্র সিরাজউদ্দৌলা তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন। আলীবর্দী খান তাঁর শাসনকালের শেষদিকে সিরাজউদ্দৌলাকে সতর্ক করে বলেছিলেন, ইংরেজরা ভবিষ্যতে বাংলার জন্য বড় ধরনের বিপদ হয়ে দেখা দিতে পারে। তাঁর এই সতর্কতা পরবর্তী সময়ে সত্য প্রমাণিত হয়েছিল।
উপসংহারে বলা যায়, আলীবর্দী খান ছিলেন বাংলার নবাবী আমলের একজন অকুতোভয় যোদ্ধা। যদি তাঁকে বর্গী আক্রমণের মতো ভয়াবহ পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে না হতো, তবে হয়তো তিনি বাংলা ও ভারতের ইতিহাসে আরও বড় কোনো সংস্কারমূলক পরিবর্তন আনতে পারতেন। তিনি তাঁর সমগ্র জীবন উৎসর্গ করেছিলেন বাংলাকে রক্ষা করার জন্য। তাঁর অদম্য ইচ্ছাশক্তি ও দূরদর্শিতা আজও ইতিহাসবিদদের কাছে শ্রদ্ধার বিষয়। (উৎস: ড. আবদুল করিম, ‘বাংলার ইতিহাস: মুঘল আমল’)