সৎসঙ্গ আশ্রম

সৎসঙ্গ আশ্রম হলো ঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের প্রবর্তিত ‘সৎসঙ্গ’ আন্দোলনের মূল কেন্দ্রবিন্দু এবং তাঁর দর্শন ও আদর্শ প্রচারের প্রধান ক্ষেত্র। ১৯১৫ সালের দিকে পাবনা জেলার হেমায়েতপুরে অনুকূলচন্দ্র চক্রবর্তী যে তপোবন বা আশ্রমটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, কালক্রমে তা ‘সৎসঙ্গ আশ্রম’ নামে বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পায়। এই আশ্রম কেবল একটি ধর্মীয় উপাসনালয় নয়, বরং এটি ছিল একটি সর্বাঙ্গীণ জীবনচর্চার কেন্দ্র। ১৯৪৬ সালে অনুকূলচন্দ্র ভারতের বিহারের দেওঘরে স্থানান্তরিত হওয়ার পর সেখানেও তিনি সৎসঙ্গের নতুন ও বিশাল এক আশ্রম গড়ে তোলেন, যা আজ তাঁর মূল স্মৃতিপীঠ হিসেবে বিবেচিত হয়।

সৎসঙ্গ আশ্রমের মূল দর্শনের চারটি স্তম্ভ হলো, শিক্ষা, কৃষি, শিল্প এবং সুবিবাহ। এই আশ্রমের লক্ষ্য হলো মানুষকে কেবল আধ্যাত্মিক দীক্ষা দেওয়া নয়, বরং তাকে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে স্বাবলম্বী ও আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা। আশ্রমের কার্যক্রমে তাই দেখা যায়—জ্ঞানচর্চার জন্য তপোবন বিদ্যালয়, স্বনির্ভরতার জন্য ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপ, ছাপাখানা ও প্রকাশনা সংস্থা, এবং শারীরিক সুস্থতার জন্য দাতব্য চিকিৎসালয়। অনুকূলচন্দ্র বিশ্বাস করতেন, মানুষের দৈহিক, মানসিক ও আত্মিক ত্রিমাত্রিক সুস্থতাই প্রকৃত জীবনের ভিত্তি, আর সৎসঙ্গ আশ্রম হলো সেই সুস্থতার সাধনার একটি সমন্বিত ক্ষেত্র।

সৎসঙ্গ আশ্রমের পরিবেশ অত্যন্ত সুশৃঙ্খল ও কর্মমুখী। এখানে কোনো নির্দিষ্ট জাতি, ধর্ম বা বর্ণের মানুষ নয়, বরং আর্তমানবতার সেবায় ব্রতী যে কেউ আশ্রিত হতে পারেন। আশ্রমের দৈনন্দিন কার্যক্রমে ভক্তিপূর্ণ প্রার্থনা বা কীর্তনের পাশাপাশি ব্যবহারিক কর্মযজ্ঞের ওপর সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়। ভক্তরা এখানে সমবেত হয়ে ঠাকুরের বাণী পাঠ করেন, তাঁর শিক্ষা নিয়ে আলোচনা করেন এবং আশ্রমে পরিচালিত নানা কল্যাণমুখী কাজে শ্রম দেন। এটি এমন এক পরিবেশ, যেখানে আধ্যাত্মিকতা ও পার্থিব শ্রমের কোনো বিরোধ নেই; বরং প্রতিটি কর্মই এখানে উপাসনা হিসেবে গণ্য হয়।

বর্তমানে সৎসঙ্গের সাংগঠনিক কার্যক্রম বাংলাদেশ ও ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে পালিত হচ্ছে। ঢাকা, চট্টগ্রাম এবং অন্যান্য জেলা শহরে প্রতিষ্ঠিত সৎসঙ্গের ছোট-বড় আশ্রম ও কেন্দ্রগুলো কেবল ভক্তদের আধ্যাত্মিক পিপাসা মেটায় না, বরং তারা আর্তমানবতার সেবা, শিক্ষা সহায়তা এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধিতেও কাজ করে যাচ্ছে। অনুকূলচন্দ্রের মহাপ্রয়াণের বহু বছর পরও সৎসঙ্গ আশ্রমগুলো তাঁর মানবতাবাদী দর্শনকে বাঁচিয়ে রেখেছে। এটি কেবল একটি আশ্রম নয়, বরং এটি একটি জীবনধারার নাম, যা মানুষকে সত্যনিষ্ঠা, সৎকর্ম এবং আত্মিক উন্নতির দিকে অবিরাম প্রেরণা দিয়ে যাচ্ছে।