তেওতা জমিদার পরিবার

তেওতা জমিদার পরিবার মানিকগঞ্জ জেলার শিবালয় উপজেলায় অবস্থিত একটি অত্যন্ত প্রভাবশালী এবং প্রগতিশীল জমিদার পরিবার। এই পরিবারটি তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার অন্যতম বৃহৎ এস্টেটের অধিকারী ছিল।

প্রতিষ্ঠা ও ইতিহাস

এই জমিদারির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন পঞ্চানন চৌধুরী (জন্ম আনুমানিক ১৭৪০ সাল), যিনি তৎকালীন মানিকগঞ্জের ষাট-ঘরের দেশগুপ্ত পরিবারের সন্তান ছিলেন। ছোটবেলায় তিনি অভাবের কারণে দিনাজপুর চলে যান এবং সেখানে তামাক ব্যবসায় প্রচুর অর্থ উপার্জন করেন। পরবর্তীতে তিনি নিজের গ্রাম তেওতায় ফিরে আসেন এবং ১৮৩০-এর দশকে তৎকালীন নবাবের কাছ থেকে ‘চৌধুরী’ উপাধি লাভ করেন। তিনি ইংরেজদের কাছ থেকে শিবালয়ের পরিত্যক্ত নীলকুঠি কিনে সেটিকে সংস্কার করে আবাসস্থল হিসেবে ব্যবহার শুরু করেন, যা পরবর্তীতে তেওতা জমিদার বাড়ি বা রাজবাড়ি হিসেবে পরিচিতি পায়।

স্থাপত্য ও বিন্যাস

তেওতা জমিদার বাড়িটি প্রায় ৭.৩৮ একর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত। মুঘল ও ইউরোপীয় স্থাপত্যশৈলীর সংমিশ্রণে তৈরি এই প্রাসাদে ৫৫টি কক্ষ ছিল। এর উল্লেখযোগ্য স্থাপনাগুলোর মধ্যে রয়েছে:

  • নবরত্ন মন্দির: চারতলাবিশিষ্ট একটি প্রাচীন মঠ, যা ধ্রুপদী স্থাপত্যের এক অনন্য নিদর্শন।

  • লালদিঘী ভবন: এটি মূলত জমিদারদের অন্দরমহল হিসেবে ব্যবহৃত হতো।

  • দোলমঞ্চ ও নাটমন্দির: পারিবারিক উৎসব ও পূজার জন্য জমিদার বাড়ির সংলগ্ন স্থানে এগুলো নির্মিত হয়েছিল।

  • ভূগর্ভস্থ কক্ষ: বিপদের সময়ে আত্মরক্ষা বা সম্পদ লুকানোর জন্য মূল প্রাসাদের নিচে একটি গোপন কক্ষ বা চোরাকুঠুরি ছিল।

পারিবারিক ঐতিহ্য ও অবদান

তেওতার জমিদাররা ছিলেন প্রগতিশীল, সংস্কারমুক্ত এবং জনহিতৈষী। তাদের উল্লেখযোগ্য কিছু অবদান হলো:

  • জনকল্যাণ: জমিদার শ্যামা শংকর রায় বাহাদুর এবং পার্বতী শংকর রায় চৌধুরী তাদের প্রজাদের প্রতি অত্যন্ত উদার ছিলেন। তারা সমবায়ভিত্তিক শস্য ব্যাংক (‘ধর্মগোলা’) চালু করেছিলেন।

  • শিক্ষা ও গবেষণা: পরিবারের অনেক সদস্যই বিদেশের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন প্রখ্যাত চিকিৎসক ড. কুমার শংকর রায় (ডা. কে. এস. রায়) এবং রাজনীতিবিদ কিরণ শংকর রায়।

  • শিল্প ও সাহিত্য: এই বাড়িটি বাংলা সাহিত্যের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের স্মৃতিবিজড়িত। কবি এখানে তাঁর স্ত্রী প্রমীলা দেবীর সঙ্গে পরিচিত হন এবং তাঁর প্রেমে মুগ্ধ হয়ে বিখ্যাত কবিতা/গান—”তুমি সুন্দর তাই চেয়ে থাকি প্রিয়/সেকি মোর অপরাধ”—লিখেছিলেন।

জমিদারি বিলুপ্তি

প্রায় দেড়শ বছর অবিভক্ত থাকার পর ১৯২০ সালের দিকে জমিদারিটি ‘জয়শংকর এস্টেট’ ও অন্যান্য ছোট ছোট ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। ১৯৫০ সালের ‘পূর্ববঙ্গ জমিদারি অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ত্ব আইন’-এর মাধ্যমে জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হলে এই এস্টেট সরকারি নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর পরিবারের সদস্যরা ভারতে চলে যান এবং বাড়িটি পরিত্যক্ত হয়।

বর্তমানে এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি অযত্ন ও অবহেলার কারণে অত্যন্ত জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে এবং এর বিভিন্ন অংশ দখলদারদের দখলে চলে গেছে। তবে স্থাপত্যিক ও ঐতিহাসিক গুরুত্বের কারণে এটি আজও মানিকগঞ্জের অন্যতম উল্লেখযোগ্য প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন।