কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদার (১৮৩৪–১৯০৭) বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগের শেষভাগ ও আধুনিক যুগের সন্ধিক্ষণের একজন বিশিষ্ট কবি ও নীতিসাহিত্যিক। তিনি মূলত তাঁর অনবদ্য নীতিমূলক কবিতার জন্য পরিচিত, যা বাঙালির ঘরে ঘরে আজও সমান জনপ্রিয়। তাঁর রচিত কবিতাগুলো কেবল ছন্দোবদ্ধ বা নান্দনিক ছিল না, বরং তা ছিল নৈতিকতা ও জীবনদর্শনের এক অনন্য পাঠশালা।
জন্ম ও পরিচয়
কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদার ১৮৩৪ সালে খুলনার দিঘলিয়া উপজেলার সেনহাটি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি তৎকালীন সময়ের একজন কৃতি পুরুষ ছিলেন, যিনি শিক্ষকতা এবং সাংবাদিকতার মাধ্যমে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিলেন। তিনি ‘মনোমোহন’ পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন এবং সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি সমাজ সংস্কারেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।
সাহিত্যিক অবদান: ‘সদ্ভাব শতক’
কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদারের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কীর্তি হলো ‘সদ্ভাব শতক’ কাব্যগ্রন্থটি। ১৮৬১ সালে প্রকাশিত এই কাব্যটি তৎকালীন বাঙালি পাঠক সমাজে অভূতপূর্ব সাড়া ফেলেছিল। এই গ্রন্থের প্রতিটি কবিতাই ছিল নৈতিক শিক্ষামূলক এবং সহজ-সরল ভাষায় রচিত। কবির মূল উদ্দেশ্য ছিল কবিতার মাধ্যমে মানুষের মনের সংকীর্ণতা দূর করা এবং তাদের সততা, ধৈর্য ও পরোপকারের পথে পরিচালিত করা।
অমর পঙ্ক্তি: ‘পরের মুখে শেখা বুলি’
কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদারের নামটি বাঙালির মনে চিরস্থায়ী হয়ে আছে তাঁর একটি অসাধারণ কবিতার জন্য, যার শিরোনাম ‘পরের মুখে শেখা বুলি’। বিশেষ করে এই পঙ্ক্তিটি আজও প্রবাদতুল্য:
“আপনারে লয়ে বিব্রত রহিতে, আসে নাই কেহ অবনী পরে; সকলের তরে সকলে আমরা, প্রত্যেকে আমরা পরের তরে।”
মানবজীবনের সার্থকতা যে অন্যের কল্যাণে নিহিত, এই অমোঘ সত্যটি তিনি যেভাবে এই চার লাইনের মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন, তা বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক অনন্য উদাহরণ। এই পঙ্ক্তিটি আজও আমাদের সহমর্মিতা ও পরোপকারের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।
কেন তিনি স্মরণীয়?
১. নীতিশিক্ষা: বাংলা সাহিত্যে নীতিমূলক কবিতার ধারাকে তিনি এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন। তাঁর লেখাগুলো জটিলতা মুক্ত হওয়ায় সব শ্রেণির পাঠকের কাছে তা সহজবোধ্য ছিল। ২. মানবতা ও পরোপকার: তাঁর কবিতার মূল সুর ছিল ‘পরের তরে বেঁচে থাকা’। তিনি মানুষকে নিজের গণ্ডি পেরিয়ে বৃহত্তর জগতের কল্যাণে ব্রতী হওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। ৩. আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি: যদিও তিনি ঊনবিংশ শতাব্দীর মানুষ, তবুও তাঁর চিন্তাধারায় ছিল আধুনিক মানবিকতার ছাপ। তিনি বর্ণবাদ, সংকীর্ণতা ও স্বার্থপরতার বিরুদ্ধে তাঁর কলম সোচ্চার রেখেছিলেন।
উপসংহার
কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদার এমন একজন কবি, যাঁর রচনার পরিমাণ হয়তো অনেক বেশি নয়, কিন্তু তাঁর সৃষ্টির গুণগত মান এবং সামাজিক প্রভাব অপরিসীম। তিনি কোনো বড় মহাকাব্য না লিখেও কেবল কয়েকটি অমর পঙ্ক্তির মাধ্যমে বাঙালির মানসপটে নিজের স্থান পাকাপোক্ত করে নিয়েছেন। আজকের প্রতিযোগিতামূলক পৃথিবীতে মানুষের প্রতি মানুষের সহমর্মিতা যখন হ্রাস পাচ্ছে, তখন কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদারের দর্শন আমাদের জন্য আজও প্রাসঙ্গিক ও পথপ্রদর্শক।