সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী

সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী (১৯৩৫–২০২২) ছিলেন বাংলাদেশের একজন প্রবীণ ও বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ, বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম প্রখ্যাত নারী নেতৃত্ব। তিনি বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের ইতিহাসে প্রথম নারী হিসেবে ‘সংসদ উপনেতা’ হওয়ার অনন্য ও ঐতিহাসিক গৌরব অর্জন করেন। ২০০৯ সালে নবম জাতীয় সংসদে তিনি প্রথমবারের মতো এই পদে আসীন হন এবং একাদিক্রমে দশম ও একাদশ জাতীয় সংসদেও সংসদ উপনেতার দায়িত্ব পালন করেন। পুরুষতান্ত্রিক রাজনীতির বলয়ে রাষ্ট্রের অন্যতম সর্বোচ্চ ও নীতিনির্ধারণী এই পদে তাঁর দীর্ঘদিনের সফল অবস্থান বাংলাদেশের নারী ক্ষমতায়নের ইতিহাসে এক অসাধারণ মাইলফলক।

তাঁর দীর্ঘ ও বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবন শুরু হয় গত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকে। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অবদান ছিল অবিস্মরণীয়; সে সময় তিনি কলকাতায় স্থাপিত ‘গোবরা নার্সিং ক্যাম্প’-এর প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক হিসেবে রণাঙ্গনের আহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা ও সেবা প্রদানে বিশাল ভূমিকা রাখেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সপরিবারে মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের পর যখন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ চরম সংকটের মুখে পড়ে, তখন দলের হাল ধরতে তিনি অসামান্য সাহসিকতার পরিচয় দেন। চরম প্রতিকূল সেই সময়ে তিনি ১৯৮৬ থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন, যা বাংলাদেশের কোনো প্রধান রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতৃত্বে একজন নারীর জন্য এক বিরল ও যুগান্তকারী অর্জন।

সংসদ উপনেতা হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ সরকারের পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবেও অত্যন্ত সফলভাবে দায়িত্ব পালন করেন। মহান মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অসামান্য অবদান এবং দীর্ঘ রাজনৈতিক ও সমাজসেবামূলক কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১০ সালে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘স্বাধীনতা পুরস্কার’-এ ভূষিত করে। আমৃত্যু আওয়ামী লীগের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম সভাপতিমণ্ডলীর (প্রেসিডিয়াম) সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করা এই মহীয়সী নেত্রী ২০২২ সালের ১১ সেপ্টেম্বর ৮৭ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন এবং রাজনীতিতে নারীর প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীর নাম ইতিহাসের পাতায় চিরকাল গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করা হবে।