মেজর আবু ওসমান চৌধুরী

মেজর আবু ওসমান চৌধুরী (১৯৩৬–২০২০) ছিলেন বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের একজন অকুতোভয় সংগঠক, ৮নং সেক্টরের প্রথম অধিনায়ক এবং একজন নিবেদিতপ্রাণ দেশপ্রেমিক। তিনি ১৯৩৬ সালের ১ জানুয়ারি চাঁদপুর জেলার ফরিদগঞ্জ উপজেলার সুবিদপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। সামরিক বাহিনীতে অত্যন্ত মেধাবী এবং সুশৃঙ্খল কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত আবু ওসমান চৌধুরী ১৯৭১ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে মেজর পদমর্যাদায় কর্মরত ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধে তাঁর সবচেয়ে বড় অবদান হলো কোনো কেন্দ্রীয় নির্দেশের অপেক্ষা না করে নিজের বিবেক ও দেশপ্রেমের তাড়নায় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে সরাসরি বিদ্রোহ ঘোষণা করা এবং কুষ্টিয়া অঞ্চলে প্রতিরোধ যুদ্ধের নেতৃত্ব দেওয়া।

মুক্তিযুদ্ধে অবদান ও ৮নং সেক্টরের নেতৃত্ব

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাত্রিতে অপারেশন সার্চলাইটের খবর পাওয়ার পর, ২৬ মার্চ সকালে চুয়াডাঙ্গায় অবস্থানরত মেজর আবু ওসমান চৌধুরী তৎক্ষণাৎ পাকিস্তান বাহিনীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন। তিনি কুষ্টিয়া, মেহেরপুর ও চুয়াডাঙ্গা অঞ্চলের ইপিআর, পুলিশ, আনসার এবং স্থানীয় ছাত্র-জনতাকে ঐক্যবদ্ধ করে এক শক্তিশালী প্রতিরোধ বাহিনী গড়ে তোলেন। তাঁর নেতৃত্বে কুষ্টিয়া অঞ্চলে মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে অত্যন্ত কার্যকর ও সাহসী গেরিলা অভিযান পরিচালনা করেন।

মুজিবনগর সরকার গঠিত হওয়ার পর মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনকে যখন ১১টি সেক্টরে ভাগ করা হয়, তখন তাঁকে ৮নং সেক্টরের অধিনায়ক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এই সেক্টরের ভৌগোলিক সীমানা ছিল সমগ্র কুষ্টিয়া, যশোর, এবং ফরিদপুর ও খুলনা জেলার কিছু অংশ। তাঁর নেতৃত্বাধীন মুক্তিযোদ্ধারা ৮নং সেক্টরে পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে অসংখ্য সফল অভিযান পরিচালনা করেন, যা পাকিস্তানি বাহিনীর মনোবল ভেঙে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। ১৯৭১ সালের আগস্ট মাস পর্যন্ত তিনি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে এই সেক্টরের কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করেন।

খেতাব ও সম্মাননা মহান মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অসামান্য অবদান, সাহসী নেতৃত্ব এবং দেশের প্রতি তাঁর নিঃস্বার্থ ত্যাগের স্বীকৃতিস্বরূপ স্বাধীনতা লাভের পর বাংলাদেশ সরকার তাঁকে সেনাবাহিনীর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সম্মানসূচক খেতাব ‘বীর উত্তম’ উপাধিতে ভূষিত করে।

যুদ্ধোত্তর জীবন ও সামাজিক ভূমিকা

  • দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন এবং পরবর্তীতে কর্নেল পদে উন্নীত হয়ে অবসর গ্রহণ করেন।

  • সামরিক জীবন থেকে অবসরের পর তিনি দেশের বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সাথে নিজেকে সম্পৃক্ত করেন।

  • তিনি একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির অন্যতম প্রধান নেতা হিসেবে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে সারা জীবন সোচ্চার ছিলেন।

  • অসাম্প্রদায়িক ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী এই মানুষটি আমৃত্যু প্রগতিশীল রাজনীতির ধারাকে সমর্থন করে গেছেন।

প্রয়াণ

দীর্ঘদিন বার্ধক্যজনিত অসুস্থতায় ভুগে এবং করোনা আক্রান্ত হয়ে ২০২০ সালের ৫ সেপ্টেম্বর ৮৪ বছর বয়সে এই বীর মুক্তিযোদ্ধা ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) মৃত্যুবরণ করেন। তাঁকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয়। মেজর আবু ওসমান চৌধুরী (বীর উত্তম) কেবল একজন সামরিক কমান্ডারই ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের এক জীবন্ত প্রতীক, যিনি দেশের চরম সংকটের মুহূর্তে দ্বিধাহীন চিত্তে দেশমাতৃকার সেবায় আত্মনিয়োগ করেছিলেন। বাংলাদেশের ইতিহাসে তাঁর এই বীরত্বপূর্ণ অবদান ও দেশপ্রেম চিরকাল শ্রদ্ধার সাথে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।