কর্নেল আবু তাহের

কর্নেল আবু তাহের, বীর উত্তম (১৯৩৮–১৯৭৬) বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের একজন অন্যতম প্রধান সেক্টর কমান্ডার, ১১নং সেক্টরের অধিনায়ক এবং বাংলাদেশের ইতিহাসের একজন অত্যন্ত প্রভাবশালী ও আলোচিত সামরিক ব্যক্তিত্ব। মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অনন্য সাহসিকতা এবং রণকৌশল তাঁকে একজন কিংবদন্তি সেনানায়কে পরিণত করেছিল। মুক্তিযুদ্ধে এবং তৎপরবর্তী সময়ে তাঁর অসামান্য অবদান ও জীবন সংগ্রাম বাংলাদেশের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

১৯৭১ সালে আবু তাহের পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ার কোরের একজন মেজর হিসেবে পশ্চিম পাকিস্তানে কর্মরত ছিলেন। ২৫শে মার্চ বাঙালিদের ওপর পাকিস্তানি বাহিনীর নৃশংস হত্যাযজ্ঞের খবর পেয়ে তিনি বিদ্রোহী হয়ে ওঠেন এবং জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মরুভূমি ও সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারত হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেন, পরবর্তীতে মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে তিনি মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে যোগ দেন। মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনকে সুসংগঠিত করার লক্ষ্যে যখন ১১টি সেক্টর গঠন করা হয়, তখন মেজর আবু তাহেরকে সমগ্র ময়মনসিংহ ও টাঙ্গাইল জেলা নিয়ে গঠিত ১১নং সেক্টরের অধিনায়ক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। ভারতের মেঘালয় রাজ্যের মহেন্দ্রগঞ্জ ছিল এই সেক্টরের সদর দপ্তর, যেখানে তাঁর নেতৃত্বে কয়েক হাজার মুক্তিযোদ্ধা গেরিলা ও সম্মুখ সমরে অংশ নিয়েছিলেন।

আরো পড়ুন:  এস ফোর্স

আবু তাহের ছিলেন অত্যন্ত চৌকস, সাহসী এবং উদ্ভাবনী রণকৌশলের অধিকারী। তাঁর নেতৃত্বে ১১নং সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানি বাহিনীর শক্তিশালী ঘাঁটিগুলোর ওপর ভয়াবহ আক্রমণ পরিচালনা করেন। বিশেষ করে ময়মনসিংহ ও টাঙ্গাইল অঞ্চলের ভূ-প্রকৃতিকে কাজে লাগিয়ে তিনি গেরিলা যুদ্ধের যে নতুন মাত্রা যোগ করেছিলেন, তা পাকিস্তানি বাহিনীকে চরম কোণঠাসা করে ফেলেছিল এবং তাঁর অসীম সাহসের কারণে মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে তিনি অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। ১৯৭১ সালের ১৪ই নভেম্বর কামালপুর পাকিস্তানি দুর্গের ওপর এক ভয়াবহ সম্মুখ সমরে আবু তাহের বীরত্বের সাথে নেতৃত্ব দিতে গিয়ে গুরুতর আহত হন এবং শত্রুসেনার ছোঁড়া একটি গোলার আঘাতে তাঁর একটি পা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এরপরও তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে তাঁর দৃঢ় মনোবল ধরে রেখেছিলেন, আর তাঁর এই আত্মত্যাগ ও বীরত্ব মুক্তিযোদ্ধাদের অসীম সাহস জুগিয়েছিল।

আরো পড়ুন:  দৈনিক সংবাদ

মহান মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অসামান্য অবদান, সম্মুখ সমরে সাহসিকতা এবং আত্মত্যাগের স্বীকৃতিস্বরূপ স্বাধীনতা লাভের পর বাংলাদেশ সরকার তাঁকে সেনাবাহিনীর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সম্মানসূচক খেতাব ‘বীর উত্তম’ উপাধিতে ভূষিত করে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি সেনাবাহিনীতে ব্রিগেডিয়ার পদে উন্নীত হন এবং অ্যাডজুটেন্ট জেনারেলের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টের পর দেশের রাজনৈতিক ও সামরিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে তিনি সেনাবাহিনীর চাকরি থেকে ইস্তফা দেন। তিনি তৎকালীন সময়ে ‘বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র’ ও বিপ্লবী পরিবর্তনের ধারণায় বিশ্বাসী ছিলেন এবং ১৯৭৫ সালের ৭ই নভেম্বর সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থানের পর তিনি সামরিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

আরো পড়ুন:  মুক্তিযুদ্ধ

কিন্তু পরবর্তী রাজনৈতিক জটিলতায় তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং ১৯৭৬ সালের ২১শে জুলাই ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে এক বিতর্কিত সামরিক গোপন বিচারের মাধ্যমে তাঁকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। আবু তাহের (বীর উত্তম) বাংলাদেশের ইতিহাসের এক জটিল ও ট্র্যাজিক চরিত্রের নাম। একদিকে তিনি ছিলেন মহান মুক্তিযুদ্ধের অকুতোভয় সেনাপতি, অন্যদিকে যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে বিপ্লবী রাজনীতির এক কেন্দ্রীয় চরিত্র। ইতিহাসের পাতায় তিনি একই সাথে বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং এক চরম রাজনৈতিক ট্র্যাজেডির শিকার হিসেবে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন।