মেজর এম. এ. জলিল (১৯৪২–১৯৮৮) ছিলেন বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম কিংবদন্তি সেক্টর কমান্ডার, ৯নং সেক্টরের অধিনায়ক এবং একজন দৃঢ়চেতা দেশপ্রেমিক। ১৯৪২ সালে বরিশাল জেলার গৌরনদীতে জন্মগ্রহণ করা এই বীর সেনানী পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে একজন অত্যন্ত সৎ ও নীতিবান কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত ছিলেন, এবং মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অসামান্য অবদান ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের রণাঙ্গনে তাঁর রণকৌশল ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন মুজিবনগর সরকার কর্তৃক বাংলাদেশকে যে ১১টি সেক্টরে ভাগ করা হয়, তার মধ্যে সমগ্র বরিশাল, পটুয়াখালী এবং খুলনা ও ফরিদপুর জেলার কিছু অংশ নিয়ে বিস্তৃত ৯নং সেক্টরের অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয় মেজর এম. এ. জলিলকে।
৯নং সেক্টরের সদর দপ্তর ছিল ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বসিরহাটের টাকি এলাকায়। মেজর জলিলের নেতৃত্বে এই সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধারা সুন্দরবনের গহীন অরণ্য এবং দক্ষিণাঞ্চলের নদীমাতৃক ভূখণ্ডকে যুদ্ধের প্রধান রণক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করেন, যার ফলে সুন্দরবন এলাকাটি মুক্তিযোদ্ধাদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয় এবং সেখান থেকে তাঁরা পাকিস্তানি বাহিনীর ওপর অতর্কিতে হামলা চালাতেন। তিনি ছিলেন একজন প্রথাগত সামরিক কর্মকর্তার পাশাপাশি একজন অসাধারণ গেরিলা নেতা, যিনি প্রতিকূল পরিবেশেও সাধারণ মানুষ ও তরুণ মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে একটি সুসংগঠিত বাহিনী গড়ে তুলেছিলেন। মহান মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অসামান্য বীরত্ব, দৃঢ় নেতৃত্ব এবং দেশপ্রেমের স্বীকৃতিস্বরূপ স্বাধীনতা লাভের পর বাংলাদেশ সরকার তাঁকে সেনাবাহিনীর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সম্মানসূচক খেতাব ‘বীর বিক্রম’ উপাধিতে ভূষিত করে।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি সেনাবাহিনীতে দায়িত্ব পালন করেন এবং ১৯৭২ সালে অবসর গ্রহণ করেন। সামরিক জীবন থেকে অবসরের পর তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত হন এবং ‘জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল’ (জাসদ) গঠনের অন্যতম উদ্যোক্তা ও এর শীর্ষস্থানীয় নেতা ছিলেন। তিনি আমৃত্যু দেশের মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে লিপ্ত ছিলেন এবং রাজনৈতিক আদর্শের প্রশ্নে ছিলেন অত্যন্ত আপসহীন। ১৯৮৮ সালের ১৯ নভেম্বর এই বীর মুক্তিযোদ্ধা ও রাজনৈতিক নেতা মৃত্যুবরণ করেন এবং তাঁকে অত্যন্ত রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয়। মেজর এম. এ. জলিল (বীর বিক্রম) কেবল একজন সেক্টর কমান্ডারই ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন এক অকুতোভয় দেশপ্রেমিক, যিনি তাঁর সমগ্র জীবনকে দেশের স্বাধীনতা ও মুক্তির সংগ্রামে উৎসর্গ করেছিলেন এবং বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাসে তাঁর নাম চিরকাল গভীর শ্রদ্ধার সাথে উচ্চারিত হবে।