মেজর নাজমুল হক

মেজর নাজমুল হক (১৯৩৮–১৯৭১) ছিলেন বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় সামরিক কর্মকর্তা এবং ৭নং সেক্টরের প্রথম অধিনায়ক। মুক্তিযুদ্ধের প্রাথমিক পর্যায়ে উত্তরবঙ্গে সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলা এবং গেরিলা যুদ্ধের নিপুণ রূপরেখা প্রণয়নে তাঁর অসামান্য অবদান ইতিহাসের পাতায় অবিস্মরণীয় হয়ে আছে। নাজমুল হক ১৯৩৮ সালের ১ আগস্ট চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার (তৎকালীন সাতকানিয়া) আমিরাবাদ ইউনিয়নে জন্মগ্রহণ করেন। পরিবারের কাছে তাঁর আদরের ডাকনাম ছিল ‘টুলু’। তাঁর বাবা হাফেজ আহমদ খান ছিলেন পেশায় একজন আইনজীবী এবং মা জয়নাব বেগম। তিনি অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র ছিলেন; কুমিল্লার পেশোয়ারা পাঠশালা থেকে ম্যাট্রিকুলেশন এবং ঢাকার জগন্নাথ কলেজ থেকে কৃতিত্বের সাথে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন। এরপর তিনি ঢাকা আহসান উল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে (বর্তমান বুয়েট) ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ভর্তি হন। কিন্তু দ্বিতীয় বর্ষে অধ্যয়নরত অবস্থায় সামরিক বাহিনীর প্রতি প্রবল আকর্ষণের কারণে তিনি পড়াশোনা ছেড়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। ১৯৬২ সালের ১৪ অক্টোবর তিনি আর্টিলারি কোরে (গোলন্দাজ বাহিনী) কমিশন লাভ করেন।

প্রাথমিক প্রতিরোধ ও মুক্তিযুদ্ধে যোগদান

১৯৭১ সালের উত্তাল মার্চ মাসে দেশব্যাপী যখন অসহযোগ আন্দোলন চলছিল, তখন ১৮ই মার্চ মেজর নাজমুল হককে নওগাঁয় অবস্থিত ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস (ইপিআর)-এর ৭নং উইংয়ের অধিনায়ক করে বদলি করা হয়। ২৫শে মার্চ কালরাত্রিতে ঢাকায় পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বরোচিত অপারেশন সার্চলাইট এবং গণহত্যার খবর যখন ২৬শে মার্চ নওগাঁয় পৌঁছায়, তখন মেজর নাজমুল হক আর মুহূর্তমাত্র কালক্ষেপণ করেননি। তিনি অবাঙালি সামরিক কর্মকর্তাদের বন্দি করে তাৎক্ষণিক বিদ্রোহ ঘোষণা করেন এবং স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করে নওগাঁ মহকুমাকে শত্রুমুক্ত স্বাধীন বাংলাদেশের অংশ হিসেবে ঘোষণা করেন। স্থানীয় যুবক, ছাত্র, আনসার ও স্বেচ্ছাসেবকদের হাতে অস্ত্র তুলে দিয়ে তিনি একটি শক্তিশালী ও স্বতঃস্ফূর্ত মুজাহিদ বাহিনী গঠন করেন। তাঁর অকুতোভয় নেতৃত্বে এই বাহিনী প্রথমেই নওগাঁ ও বগুড়ার পাকিস্তানি হানাদারদের ক্যাম্প দখল করে সমগ্র বগুড়া জেলাকে সাময়িকভাবে শত্রুমুক্ত করতে সক্ষম হয়। ২৮শে মার্চ তাঁর বাহিনীর সাঁড়াশি আক্রমণে রাজশাহী ক্যান্টনমেন্টে হানাদাররা অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে।

৭নং সেক্টরের অধিনায়ক হিসেবে বীরত্ব ও রণকৌশল

পরবর্তীতে মুজিবনগর সরকার কর্তৃক সমগ্র বাংলাদেশ এবং রণাঙ্গনকে যখন সুসংগঠিতভাবে ১১টি সেক্টরে ভাগ করা হয়, তখন মেজর নাজমুল হককে ৭নং সেক্টরের অধিনায়কের দায়িত্ব অর্পণ করা হয়। এই সেক্টরের ভৌগোলিক সীমানা ছিল সমগ্র রাজশাহী, পাবনা, বগুড়া এবং দিনাজপুর জেলার দক্ষিণাঞ্চল। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের তরঙ্গপুরে ছিল এই সেক্টরের সদর দপ্তর। এই সেক্টরের অধীনে ৮টি সাব-সেক্টর গঠিত হয়েছিল। মেজর নাজমুল হক ছিলেন অত্যন্ত সাহসী, পরিশ্রমী ও দূরদর্শী একজন সেনাপতি। নিয়মিত সামরিক বাহিনীর পাশাপাশি সাধারণ ছাত্র, কৃষক ও যুবকদের নিয়ে তিনি প্রায় ১৫ হাজার মুক্তিযোদ্ধার এক বিশাল বাহিনী গড়ে তোলেন। তাঁর সেক্টরে গেরিলা যুদ্ধ পরিচালনার পাশাপাশি সম্মুখ সমরেও ঈর্ষণীয় সফলতা অর্জিত হয়েছিল। বিশেষ করে জুনের মাঝামাঝি সময়ে দিনাজপুরের ধনধনিয়াপাড়া এবং জুলাই মাসে কাঞ্চন সেতুর ওপর তাঁর প্রত্যক্ষ নেতৃত্বে পরিচালিত আক্রমণগুলো পাকিস্তানি বাহিনীর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি সাধন করে। উল্লেখ্য, বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর ৭নং সেক্টরে মেজর নাজমুল হকের অধীনেই যুদ্ধ করেছিলেন।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে উপস্থিতি ও দেশপ্রেম

একাত্তরের মে মাসের প্রথম সপ্তাহে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সাপ্তাহিক ‘নিউজউইক’ (Newsweek)-এর প্রখ্যাত সাংবাদিক মিলান জে. কিউবিক (Milan J. Cubic) রণাঙ্গন পরিদর্শন করে মেজর নাজমুল হকের সাহসিকতা, অটুট মনোবল ও রণকৌশল নিয়ে একটি বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করেন। এর ফলে বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রাম এবং এই বীর কমান্ডারের নাম আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করে। এছাড়া রণাঙ্গন থেকে ২২শে মে তাঁর বড় ভাই আজিজুল হকের কাছে লেখা একটি আবেগঘন চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন, “প্রয়োজনে আমি আমাকে ত্যাগ করব বাংলাদেশের যুদ্ধের জন্য। এই যুদ্ধ হয়তো চলতে থাকবে বছরের পর বছর, তারপরও ছাড়ব না। আমরা সবকিছুই হারিয়েছি। আমরা এখন মরিয়া হয়ে গেছি, নিঃস্ব হয়ে গেছি।” তাঁর এই উক্তি থেকেই দেশের প্রতি তাঁর অকৃত্রিম ভালোবাসা ও স্বাধীনতার প্রতি দৃঢ় প্রতিজ্ঞার প্রমাণ পাওয়া যায়।

মর্মান্তিক মৃত্যু ও সমাধি

রণাঙ্গনে যখন তিনি একের পর এক সফল সামরিক অভিযান পরিচালনা করছিলেন এবং বিজয় যখন ক্রমশ দৃশ্যমান হচ্ছিল, তখনই এক চরম আকস্মিক ট্র্যাজেডি তাঁর জীবনে নেমে আসে। ১৯৭১ সালের ২৭শে সেপ্টেম্বর মিত্রবাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সাথে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সামরিক বৈঠক শেষে ভারতের শিলিগুড়ি ক্যান্টনমেন্ট থেকে তরঙ্গপুর সদর দপ্তরে ফেরার পথে তাঁর জিপ গাড়িটি এক ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হয়। এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় মাত্র ৩৩ বছর বয়সে এই অকুতোভয় দেশপ্রেমিক বীর সেনানী প্রাণ হারান। তাঁকে অত্যন্ত সম্মান ও মর্যাদার সাথে চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ থানায় অবস্থিত ঐতিহাসিক ছোট সোনা মসজিদ প্রাঙ্গণে সমাহিত করা হয়। তাঁর আকস্মিক মৃত্যুর পর মেজর কাজী নুরুজ্জামানকে ৭নং সেক্টরের নতুন অধিনায়ক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। পরবর্তীতে বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর শহীদ হলে তাঁকেও এই সোনা মসজিদ প্রাঙ্গণে তাঁর প্রিয় কমান্ডার মেজর নাজমুল হকের সমাধির পাশেই সমাহিত করা হয়।

খেতাববঞ্চনা ও ঐতিহাসিক মূল্যায়ন

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে এত বিশাল অবদান এবং রণাঙ্গনে একটি গুরুত্বপূর্ণ সেক্টর কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করা সত্ত্বেও, মেজর নাজমুল হককে রাষ্ট্রীয়ভাবে কোনো বীরত্বসূচক খেতাব (যেমন: বীর উত্তম বা বীর বিক্রম) প্রদান করা হয়নি। এর প্রধান কারণ হিসেবে সামরিক নীতিমালায় বলা হয় যে, তিনি সরাসরি শত্রুর গুলিতে বা সম্মুখ সমরে শহীদ হননি, বরং একটি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছিলেন। স্বাধীন বাংলাদেশের খেতাব প্রদানের নীতিমালায় সম্মুখ সমর ব্যতীত এ ধরনের মৃত্যুর ক্ষেত্রে খেতাব বরাদ্দের সুস্পষ্ট আইনি বিধান না থাকায় তিনি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি থেকে বঞ্চিত থেকে যান। তাঁকে তাই মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের ‘খেতাববঞ্চিত এক মহান বীর’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। তবে রাষ্ট্রীয় খেতাব বা পদক জুটুক বা না জুটুক, মুক্তিযুদ্ধের সূচনালগ্নে উত্তরবঙ্গে যে অভূতপূর্ব প্রতিরোধ তিনি গড়ে তুলেছিলেন এবং হাজার হাজার তরুণকে যেভাবে যুদ্ধের ময়দানে সংগঠিত করেছিলেন, তার জন্য স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে মেজর নাজমুল হকের নাম চিরকাল অপরিসীম শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতা ও বিনম্র গৌরবের সাথে স্মরণ করা হবে।