মেজর এ.এন.এম. নুরুজ্জামান (১৯৩৮–১৯৯৩) বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের একজন অকুতোভয় বীর সেনানী, ঐতিহাসিক আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার অন্যতম অভিযুক্ত এবং মুক্তিযুদ্ধের ৩নং সেক্টরের অধিনায়ক। স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং যুদ্ধোত্তর দেশ গঠনে তাঁর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
(উল্লেখ্য, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে দুজন নুরুজ্জামান সেক্টর কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ৭নং সেক্টরের কমান্ডার ছিলেন মেজর কাজী নুরুজ্জামান। আর ৩নং সেক্টরের কমান্ডার ছিলেন মেজর এ.এন.এম. নুরুজ্জামান। এখানে ৩নং সেক্টরের কমান্ডারের কথা বলা হচ্ছে।)
মুক্তিযুদ্ধে এবং তৎপরবর্তী সময়ে মেজর এ.এন.এম. নুরুজ্জামানের গুরুত্বপূর্ণ অবদানগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা ও দেশপ্রেম
পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে ক্যাপ্টেন হিসেবে কর্মরত থাকা অবস্থায় তিনি বাঙালিদের প্রতি বৈষম্য ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার গোপন পরিকল্পনায় যুক্ত থাকার অভিযোগে ১৯৬৮ সালে পাকিস্তান সরকার যে ঐতিহাসিক ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’ (রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিবুর রহমান ও অন্যান্য) দায়ের করে, তাতে তাঁকেও অন্যতম আসামি করা হয়। এই মামলায় তিনি চরম নির্যাতন ভোগ করেন এবং পরবর্তীতে ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের মুখে বঙ্গবন্ধুসহ অন্য আসামিদের সাথে তিনিও মুক্তি পান।
মুক্তিযুদ্ধে যোগদান ও ৩নং সেক্টরের নেতৃত্ব
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি কালক্ষেপণ না করে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। মুক্তিযুদ্ধের প্রথম দিকে ৩নং সেক্টরের (সিলেট জেলার অংশবিশেষ এবং কুমিল্লা ও ঢাকা জেলার কিছু অংশ) কমান্ডার ছিলেন মেজর কে.এম. শফিউল্লাহ। কিন্তু ১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে শফিউল্লাহ সম্মুখ সমরের জন্য ‘এস ফোর্স’ গঠনের দায়িত্ব নিয়ে চলে গেলে, মেজর এ.এন.এম. নুরুজ্জামান ৩নং সেক্টরের অধিনায়কের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
রণাঙ্গনে তাঁর অবদান
ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের হেজামারায় ছিল ৩নং সেক্টরের সদর দপ্তর। মেজর নুরুজ্জামানের সুযোগ্য ও সুশৃঙ্খল নেতৃত্বে এই সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধারা আখাউড়া, শ্রীমঙ্গল, কসবা এবং সিলেট-কুমিল্লা সীমান্তবর্তী বিভিন্ন অঞ্চলে পাকিস্তানি বাহিনীর ওপর তীব্র ও সফল গেরিলা আক্রমণ পরিচালনা করেন। তাঁর অধীনে থাকা গেরিলা যোদ্ধারা শত্রুর যোগাযোগ ব্যবস্থা ও রসদ সরবরাহের পথ চরমভাবে বিপর্যস্ত করে দিয়েছিলেন।
জাতীয় রক্ষীবাহিনী গঠন
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সদ্য স্বাধীন দেশের অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার এবং চোরাচালান রোধের উদ্দেশ্যে ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ সরকার ‘জাতীয় রক্ষীবাহিনী’ (Jatiya Rakkhi Bahini) গঠন করে। মেজর এ.এন.এম. নুরুজ্জামানকে এই নবগঠিত আধা-সামরিক বাহিনীর প্রথম মহাপরিচালক (Director General) হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত তিনি এই বাহিনীর প্রধান হিসেবে অত্যন্ত প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করেন।
যুদ্ধোত্তর কূটনৈতিক দায়িত্ব ও প্রয়াণ
-
১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের পর দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটে এবং জাতীয় রক্ষীবাহিনীকে সেনাবাহিনীর সাথে একীভূত করা হয়।
-
এরপর তাঁকে সামরিক বাহিনী থেকে কূটনৈতিক দায়িত্বে বদলি করা হয়। তিনি অস্ট্রেলিয়া, ফিলিপাইন, সেনেগাল, কানাডা ও সুইডেনসহ বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ও হাইকমিশনার হিসেবে দীর্ঘদিন সফলতার সাথে দায়িত্ব পালন করেন।
-
১৯৯৩ সালে এই অকুতোভয় বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সংগঠক মৃত্যুবরণ করেন।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম, বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধের প্রাথমিক পর্যায়ে রাজনৈতিক ও সামরিক প্রস্তুতির ইতিহাসে মেজর এ.এন.এম. নুরুজ্জামানের নাম অত্যন্ত সম্মানের সাথে স্মরণ করা হয়।