মেজর জেনারেল চিত্তরঞ্জন দত্ত (১৯২৭–২০২০), যিনি সি. আর. দত্ত নামেই সমধিক পরিচিত, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের অন্যতম অকুতোভয় সেক্টর কমান্ডার, ৪নং সেক্টরের অধিনায়ক এবং স্বাধীন বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (তৎকালীন বিডিআর) প্রথম মহাপরিচালক।
মুক্তিযুদ্ধে এবং যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে তাঁর অসামান্য অবদানগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
প্রাথমিক প্রতিরোধ ও মুক্তিযুদ্ধে যোগদান
১৯৭১ সালের উত্তাল মার্চ মাসে মেজর সি. আর. দত্ত পাকিস্তান সেনাবাহিনী থেকে এক মাসের ছুটিতে নিজ জেলা হবিগঞ্জে (তৎকালীন সিলেট জেলার মহকুমা) অবস্থান করছিলেন। ২৫শে মার্চ কালরাত্রিতে পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বরোচিত হত্যাযজ্ঞের খবর পাওয়ার পর তিনি আর চাকরিতে ফিরে যাননি। কালক্ষেপণ না করে তিনি স্থানীয় বাঙালি সৈনিক, ইপিআর (EPR), পুলিশ ও ছাত্র-জনতাকে সংগঠিত করেন এবং সিলেটের চা বাগান ও সীমান্তবর্তী অঞ্চলে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রাথমিক প্রতিরোধ গড়ে তোলেন।
৪নং সেক্টরের অধিনায়ক
মুক্তিযুদ্ধকে সুসংগঠিত করার লক্ষ্যে যখন বাংলাদেশকে ১১টি সেক্টরে ভাগ করা হয়, তখন মেজর সি. আর. দত্তকে ৪নং সেক্টরের অধিনায়ক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এই সেক্টরের ভৌগোলিক সীমানা ছিল সিলেট জেলার পূর্বাঞ্চল এবং খোয়াই-শায়েস্তাগঞ্জ রেললাইন পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকা। আসামের করিমগঞ্জে ছিল এই সেক্টরের সদর দপ্তর। চা বাগান, হাওর এবং দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় তাঁর সুদক্ষ রণকৌশল ও নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানি বাহিনীর ওপর অসংখ্য সফল গেরিলা ও সম্মুখ আক্রমণ পরিচালনা করেন।
বাংলাদেশ রাইফেলস (বিডিআর) গঠন
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের সীমান্ত সুরক্ষার জন্য যখন সীমান্তরক্ষী বাহিনী গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়, তখন ১৯৭২ সালে সি. আর. দত্তকে নবগঠিত ‘বাংলাদেশ রাইফেলস’ বা বিডিআর (বর্তমান বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ – বিজিবি)-এর প্রথম মহাপরিচালক (Director General) হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। স্বাধীন দেশের প্রথম সীমান্তরক্ষী বাহিনীর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন এবং এটিকে একটি সুশৃঙ্খল বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য।
খেতাব ও সম্মাননা
মহান মুক্তিযুদ্ধে অতুলনীয় সাহসিকতা, বীরত্ব এবং সফল সামরিক নেতৃত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার তাঁকে সেনাবাহিনীর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সম্মানসূচক খেতাব ‘বীর উত্তম’ উপাধিতে ভূষিত করে।
যুদ্ধোত্তর জীবন ও সামাজিক আন্দোলন
-
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে তিনি মেজর জেনারেল পদে উন্নীত হন এবং ১৯৭৩ সালের পর সেনা সদরে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।
-
১৯৭৭ সালে সামরিক বাহিনী থেকে অবসরের পর তিনি রাজনীতি ও সামাজিক আন্দোলনে যুক্ত হন।
-
মুক্তিযুদ্ধের অসাম্প্রদায়িক চেতনা বাস্তবায়ন এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে তিনি ১৯৮৮ সালে ‘বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ’ প্রতিষ্ঠা করেন। আমৃত্যু তিনি এই সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও মানবাধিকার রক্ষায় অগ্রণী ভূমিকা রাখেন।
প্রয়াণ
বার্ধক্যজনিত নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগে ২০২০ সালের ২৫শে আগস্ট যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় এই কিংবদন্তি বীর সেনানী ৯৩ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁকে বিদায় জানানো হয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং একটি অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র গঠনের আন্দোলনে তাঁর নাম চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।