লেফটেন্যান্ট কর্নেল এ.টি.এম. হায়দার

লেফটেন্যান্ট কর্নেল এ.টি.এম. হায়দার (১৯৪২–১৯৭৫) বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম কিংবদন্তি বীর সেনানী, ২নং সেক্টরের অধিনায়ক এবং গেরিলা যোদ্ধাদের প্রধান প্রশিক্ষক। মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অসামান্য অবদান, বিশেষ করে তরুণ ছাত্র-জনতাকে দুর্ধর্ষ গেরিলা হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা ইতিহাসের পাতায় চিরস্মরণীয়। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি ‘মেজর হায়দার’ নামেই সমধিক পরিচিত ছিলেন।

মুক্তিযুদ্ধে এবং তৎপরবর্তী সময়ে তাঁর অসামান্য অবদান ও মর্মান্তিক পরিণতি নিচে তুলে ধরা হলো:

বিদ্রোহ ও মুক্তিযুদ্ধে যোগদান

১৯৭১ সালের মার্চ মাসে এ.টি.এম. হায়দার (আবু তাহের মোহাম্মদ হায়দার) পাকিস্তান সেনাবাহিনীর স্পেশাল সার্ভিস গ্রুপ (SSG)-এর একজন ক্যাপ্টেন হিসেবে কুমিল্লা সেনানিবাসে কর্মরত ছিলেন। ২৫শে মার্চের পর তিনি পাকিস্তানি বাহিনী থেকে বিদ্রোহ করে পালিয়ে যান এবং মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। তিনি ছিলেন একজন কমান্ডো এবং বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞ। মুক্তিযুদ্ধে যোগদানের পর মেজর খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে গঠিত ২নং সেক্টরের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড (2IC) হিসেবে তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

মেলাঘর ক্যাম্প ও গেরিলা প্রশিক্ষণ

ভারতের ত্রিপুরার ‘মেলাঘর’ ছিল ২নং সেক্টরের প্রধান সদর দপ্তর ও প্রশিক্ষণ শিবির। এই মেলাঘর ক্যাম্পের প্রধান প্রশিক্ষক ছিলেন মেজর হায়দার। তাঁর কমান্ডো ব্যাকগ্রাউন্ড থাকার কারণে তিনি ছিলেন অত্যন্ত সুঠাম, কঠোর শৃঙ্খলাপরায়ণ এবং সাহসী। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে (বিশেষ করে ঢাকা থেকে) পালিয়ে আসা হাজার হাজার ছাত্র, তরুণ ও সাধারণ মানুষকে তিনি মাত্র কয়েক সপ্তাহের কঠোর প্রশিক্ষণে দুর্ধর্ষ গেরিলা যোদ্ধায় পরিণত করতেন। তাঁর উদ্দীপনামূলক বক্তব্য এবং কমান্ডো স্টাইলের প্রশিক্ষণ মুক্তিযোদ্ধাদের প্রবল আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছিল।

‘ক্র্যাক প্লাটুন’ (Crack Platoon) গঠনে ভূমিকা

মেজর খালেদ মোশাররফের পরিকল্পনায় ঢাকা শহরে যে দুর্ধর্ষ ‘ক্র্যাক প্লাটুন’ গঠিত হয়েছিল, তার মূল কারিগর ও প্রশিক্ষক ছিলেন মেজর হায়দার। শহীদ শাফী ইমাম রুমী, বদিউল আলম, আবদুল হালিম জুয়েল, মায়া, ফতেহ আলী চৌধুরীসহ ঢাকার বিখ্যাত সব গেরিলা যোদ্ধারা মেলাঘরে মেজর হায়দারের হাতেই অস্ত্র চালনা ও বিস্ফোরক ব্যবহারের নিখুঁত প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছিলেন।

২নং সেক্টরের অধিনায়ক ও সম্মুখ সমর

১৯৭১ সালের ২৩শে অক্টোবর কসবার যুদ্ধে ২নং সেক্টরের কমান্ডার মেজর খালেদ মোশাররফ মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে মারাত্মকভাবে আহত হলে, মেজর এ.টি.এম. হায়দার ২নং সেক্টর এবং ‘কে ফোর্স’-এর অধিনায়কের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর সুযোগ্য নেতৃত্বে এই সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধারা আখাউড়া, কসবা, ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ বৃহত্তর কুমিল্লা ও নোয়াখালী অঞ্চলে পাকিস্তানি বাহিনীর ওপর তীব্র আক্রমণ চালান এবং ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে ঢাকা অভিমুখে অগ্রসর হন।

১৬ই ডিসেম্বরের ঐতিহাসিক মুহূর্ত

১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর ঢাকায় যখন পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের প্রস্তুতি চলছিল, তখন মিত্রবাহিনীর পাশাপাশি মেজর এ.টি.এম. হায়দার তাঁর সহযোদ্ধাদের নিয়ে ঢাকা শহরে প্রবেশ করেন। রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) জেনারেল নিয়াজীর ঐতিহাসিক আত্মসমর্পণের সময় মেজর হায়দার সেখানে সশরীরে উপস্থিত ছিলেন, যা তাঁর সামরিক জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মুহূর্ত।

খেতাব ও সম্মাননা

মহান মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য বীরত্ব, অতুলনীয় গেরিলা কৌশল এবং সফল নেতৃত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার তাঁকে সেনাবাহিনীর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সম্মানসূচক খেতাব ‘বীর উত্তম’ উপাধিতে ভূষিত করে।

যুদ্ধোত্তর জীবন ও মর্মান্তিক পরিণতি

  • দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে লেফটেন্যান্ট কর্নেল পদে উন্নীত হন এবং চট্টগ্রামে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টাল সেন্টারে (EBRC) এবং পরবর্তীতে ঢাকায় কর্মরত ছিলেন।

  • ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর সেনাবাহিনীতে চরম বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। চেইন অব কমান্ড ফিরিয়ে আনতে ৩রা নভেম্বর মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে একটি সামরিক অভ্যুত্থান ঘটে, যেখানে লে. কর্নেল হায়দার তাঁকে সমর্থন করেন।

  • কিন্তু চরম দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, এর মাত্র কয়েকদিন পর ৭ই নভেম্বর সংঘটিত পাল্টা সামরিক অভ্যুত্থানে (সিপাহি-জনতার বিপ্লব) ঢাকার শেরেবাংলা নগরে মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফ, কর্নেল খন্দকার নাজমুল হুদা এবং লে. কর্নেল এ.টি.এম. হায়দারকে অত্যন্ত নির্মম ও নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয়।

মাত্র ৩৩ বছর বয়সে এই বীর কমান্ডো এবং গেরিলা প্রশিক্ষকের এমন মর্মান্তিক মৃত্যু স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে এক কালো অধ্যায় এবং জাতির জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি।