অন্তর্মৃত্তিকা বা সাবসয়েল (Subsoil) হলো ভূপৃষ্ঠের উপরিভাগের স্তর অর্থাৎ পৃষ্ঠমৃত্তিকার (Topsoil) ঠিক নিচের স্তর। মাটি গঠন প্রক্রিয়ার দীর্ঘস্থায়ী প্রভাবে এই স্তরের পলি বা শিলার আদি অবস্থার ব্যাপক পরিবর্তন সাধিত হয়। মৃত্তিকা বিজ্ঞানের স্তরবিন্যাসে অনেক সময় এই স্তরটিকে ভুলবশত কেবল ‘খ’ স্তর (B-horizon) হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। বাস্তবে, ‘খ’ স্তরের অন্তর্তলের অন্তর্ভুক্ত এই স্তরে মাটির ওপর থেকে এবং কখনও কখনও নিচ থেকেও বিভিন্ন খনিজ ও উপাদানের পরিস্রুতি (Leaching) বা স্থানান্তর সংঘটিত হয়।
জলবায়ু ও গঠনগত বৈশিষ্ট্য
ভৌগোলিক ও জলবায়ুগত ভিন্নতার কারণে অন্তর্মৃত্তিকার উপাদানে ব্যাপক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়:
-
আর্দ্র অঞ্চলে: যেসব অঞ্চলে বৃষ্টিপাত বেশি, সেখানকার অন্তর্মৃত্তিকায় প্রধানত লোহা (Iron), অ্যালুমিনিয়াম অক্সাইড এবং সিলিকেট কাদার (Silicate clays) মতো পদার্থ সবচেয়ে বেশি সঞ্চিত হয়।
-
শুষ্ক ও আধা-শুষ্ক অঞ্চলে: অন্যদিকে, শুষ্ক জলবায়ু সম্পন্ন অঞ্চলে বৃষ্টিপাত কম হওয়ায় এই স্তরে ক্যালসিয়াম কার্বনেট, ক্যালসিয়াম সালফেট এবং অন্যান্য খনিজ লবণ অধিক মাত্রায় জমা হতে দেখা যায়।
কৃষি ও বাস্তুসংস্থানে ভূমিকা
ভূমির উপরিভাগ থেকে অন্তর্মৃত্তিকাকে খালি চোখে দেখা যায় না। কৃষিকাজে জমি কর্ষণ বা লাঙল চাষের ফলেও এই স্তরটি সাধারণত অক্ষত থাকে এবং ক্ষতিগ্রস্ত হয় না। মাটির উপরিভাগের অনেক ব্যবহার রয়েছে যা অন্তর্মৃত্তিকার বৈশিষ্ট্যের দ্বারা খুব একটা প্রভাবিত হয় না।
তবে কৃষি উৎপাদনের সার্বিক সফলতা অন্তর্মৃত্তিকার ওপর গভীরভাবে নির্ভরশীল। কারণ, উদ্ভিদের শিকড় সঞ্চারণ, মাটির গভীরে আর্দ্রতা ধরে রাখা এবং পুষ্টি উপাদান সরবরাহের ক্ষেত্রে এই স্তরের ভূমিকা অপরিসীম। অন্যদিকে, অন্তর্মৃত্তিকা যদি অপ্রবেশ্য (Impermeable) হয়, তবে তা বৃষ্টির বা সেচের পানির নিম্নমুখী প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করে। এর ফলে মাটিতে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়, যা অধিকাংশ ফসলের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও ফলনের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অন্তর্মৃত্তিকার বৈচিত্র্য
ভৌগোলিক বৈচিত্র্যের কারণে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অন্তর্মৃত্তিকার ধরন, রং এবং রাসায়নিক বৈশিষ্ট্যে ব্যাপক পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়:
-
প্লাবনভূমির মাটি: চুনমুক্ত বাদামি প্লাবনভূমির অন্তর্মৃত্তিকা সাধারণত হলদেটে-বাদামি রঙের এবং মাঝারি থেকে নিরপেক্ষ অম্ল প্রবণতা-বিশিষ্ট (Acidic) হয়। ধূসর প্লাবনভূমির অন্তর্মৃত্তিকা ১৫ থেকে ৫০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত পুরু হয় এবং এটি নিরপেক্ষ থেকে হালকা ক্ষারীয় প্রকৃতির। তবে পূর্ব সুরমা-কুশিয়ারা প্লাবনভূমি, চট্টগ্রাম উপকূলীয় সমতলভূমি এবং মধ্য মেঘনা প্লাবনভূমির অন্তর্মৃত্তিকা সামান্য থেকে মাঝারি মাত্রার অম্লীয়।
-
চুনযুক্ত গাঢ় ধূসর প্লাবনভূমি: এই এলাকার অন্তর্মৃত্তিকা সাধারণত ৩০-৬০ সেন্টিমিটার পুরু হয় এবং এতে পলির স্তরবিন্যাস প্রায় অনুপস্থিত থাকে।
-
অম্ল অববাহিকীয় কাদা: এই ধরনের মাটির অন্তর্মৃত্তিকা তীব্র থেকে সুতীব্র অম্লীয় প্রকৃতির হয়ে থাকে।
-
পাহাড়ি ও পাদদেশীয় মাটি: বৃহত্তর সিলেট এলাকার পর্বতমালা ঘেঁষে অবস্থিত ধূসর পাদদেশীয় মাটির অন্তর্মৃত্তিকার রং অধিকতর লালচে হয়। বাদামি পাহাড়ি মাটির অন্তর্মৃত্তিকা এক-তৃতীয়াংশ থেকে এক মিটার পর্যন্ত পুরু হতে পারে এবং এর রং কড়া বাদামি থেকে হলদে বাদামির মধ্যে লাল ছোপযুক্ত হয়।
-
সোপান মাটি (Terrace Soils): গাঢ় লালাভ-বাদামি সোপান মাটির অন্তর্মৃত্তিকা লালাভ-বাদামি থেকে হলদেটে বাদামি রঙের এবং তা বেশ ভঙ্গুর বা চূর্ণনীয় প্রকৃতির হয়। অগভীর লালাভ-বাদামি সোপান মাটিতে ৩০ থেকে ৬০ সেন্টিমিটার পুরু লাল মাটির কঠিন কর্দমযুক্ত অন্তর্মৃত্তিকা দেখা যায়। অন্যদিকে, হলদে-বাদামি সোপান মাটিতে সরন্ধ্র (Porous) দোআঁশ অন্তর্মৃত্তিকা বিদ্যমান।
প্লাবনভূমিতে বাতান্বয়ন (Aeration) প্রক্রিয়া
বাংলাদেশের প্লাবনভূমি এলাকার অধিকাংশ মাটি উপরিভাগ থেকে আসা ধূসর, আধা-ধূসর ও গাঢ় ধূসর রঙের পরিবাহিত পলল পদার্থে আচ্ছাদিত থাকে। এই আচ্ছাদনের ফলে ওপরের মাটি নিচে স্থানান্তরিত হয়, যা মাটিতে বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থের মিথস্ক্রিয়া (Interaction) বৃদ্ধি করে। ফলস্বরূপ, অন্তর্মৃত্তিকায় রঙের বৈপরীত্যও তীব্রতর হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশের প্লাবনভূমির অন্তর্মৃত্তিকার একটি বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্য হলো, এটি প্লাবিত বা নিমজ্জিত অবস্থাতেও বাতান্বিত (Aerated) থাকে। এমনকি পানিতে সম্পূর্ণ ডুবে থাকলেও এই স্তরে বায়ু চলাচল অব্যাহত থাকে। অকর্ষিত জমিতেও অবায়ুজীবী (Anaerobic) উপরিভাগ স্তরের নিচে অন্তর্মৃত্তিকা বাতান্বিত থাকে। এর একটি বড় কারণ হলো, নিমজ্জিত মাটিতে অবস্থিত ধানসহ অন্যান্য ফসলের শিকড়ের সাহায্যে বাতাস মাটির উপরিভাগ থেকে অন্তর্মৃত্তিকায় পরিবাহিত হতে পারে।
[উৎস: বাংলাপিডিয়া – বাংলাদেশ জাতীয় জ্ঞানকোষ]