অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া

হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের জীবনচক্রে যে ষোলোটি প্রধান মাঙ্গলিক সংস্কার বা ‘ষোড়শ সংস্কার’ রয়েছে, তার সর্বশেষ এবং অন্তিম সংস্কারটি হলো ‘অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া’। সংস্কৃত শব্দ ‘অন্ত’ এবং ‘ইষ্টি’ শব্দদ্বয়ের মিলনে এই শব্দটি গঠিত হয়েছে। এখানে ‘অন্ত’ শব্দের অর্থ হলো ‘শেষ’ বা ‘চূড়ান্ত’, এবং ‘ইষ্টি’ শব্দের অর্থ হলো ‘সংস্কার’, ‘যজ্ঞ’ বা ‘পবিত্র আচার’। সুতরাং, আভিধানিক অর্থে মানুষের মৃত্যুর পর তার নশ্বর দেহকে পঞ্চভূতে বিলীন করার উদ্দেশ্যে হিন্দু শাস্ত্রীয় নিয়মে যে শবদাহ ক্রিয়া বা শেষকৃত্য সম্পন্ন করা হয়, তাকেই অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া বলা হয়। হিন্দু ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, মৃত্যুর মাধ্যমে আত্মার কেবল শরীরান্তর ঘটে, কিন্তু এই অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার মাধ্যমেই আত্মাকে তার পুরনো পার্থিব শরীরের মায়া থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত করে পরলোকের উদ্দেশ্যে অনন্ত যাত্রার পথ সুগম করে দেওয়া হয়। [উৎস: হিন্দু ধর্ম ও স্মৃতিশাস্ত্র]

শবদেহ প্রস্তুতকরণ ও প্রাথমিক আচার

মৃতদেহকে শ্মশানে নেওয়ার পূর্বে এবং দাহ করার আগে বাড়িতে বেশ কিছু শাস্ত্রীয় ও পবিত্র আচার পালন করা হয়। প্রথমে মৃতদেহকে পবিত্র জলে স্নান করানো হয় এবং এরপর সারা শরীরে ঘি ও সুগন্ধি চন্দন বাটা মাখানো হয়। এরপর একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ আচার পালন করা হয়, যেখানে মৃতের দুই কান, নাকের দুটি ছিদ্র, দুটি চোখ এবং মুখমণ্ডল—এই সাতটি ইন্দ্রিয় বা অঙ্গে মোট সাত টুকরা সোনা অথবা কাঁসা স্পর্শ করানো বা রাখা হয়। সোনা হিন্দু ধর্মে অত্যন্ত পবিত্র ধাতু হিসেবে বিবেচিত, যা শুদ্ধতার প্রতীক। এই আচার পালনের পর মৃতের উদ্দেশ্যে প্রথম ‘পিণ্ড’ দান করা হয়, যা আত্মার প্রতি পরিবারের শ্রদ্ধা ও খাদ্যের প্রতীকী নিবেদন। [উৎস: হিন্দু ধর্মীয় রীতিনীতি ও প্রথা]

দাহকার্য ও মুখাগ্নি

প্রয়োজনীয় আচার শেষে শবদেহকে বাঁশের তৈরি খাটিয়ায় করে শ্মশানে নিয়ে যাওয়া হয় এবং চিতার ওপর সসম্মানে স্থাপন করা হয়। হিন্দু ধর্মে অগ্নিকে সকল অশুদ্ধি বিনাশকারী এবং দেবতা ও মানুষের মধ্যে সংযোগস্থাপনকারী পবিত্র মাধ্যম হিসেবে ধরা হয়। তাই অগ্নির মাধ্যমে নশ্বর দেহকে ভস্মীভূত করার প্রথা প্রচলিত। চিতার ওপর শবদেহ স্থাপনের পর মৃতের পুত্র (প্রধানত জ্যেষ্ঠপুত্র বা তার অবর্তমানে অন্য কোনো পুত্র) অথবা কোনো অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ আত্মীয় চিতার চারপাশে তিনবার প্রদক্ষিণ করেন। প্রদক্ষিণ শেষে তিনি জ্বলন্ত মশাল বা আগুনের সাহায্যে মৃতদেহের মুখে অগ্নি স্পর্শ করান। অত্যন্ত আবেগঘন ও পবিত্র এই প্রথাটিকে বলা হয় ‘মুখাগ্নি’। মুখাগ্নির মাধ্যমে পার্থিব দেহের সাথে আত্মার সকল ভৌতিক বন্ধন আনুষ্ঠানিকভাবে ছিন্ন করা হয় বলে বিশ্বাস করা হয়। [উৎস: বাংলাপিডিয়া – বাংলাদেশ জাতীয় জ্ঞানকোষ]

চিতা নির্বাপণ ও ভস্ম সংগ্রহ

দাহকার্য প্রায় শেষ হয়ে এলে এবং দেহ ভস্মীভূত হওয়ার পর আরও কিছু সুনির্দিষ্ট আচার পালন করতে হয়। চিতাগ্নিতে এক এক করে সাত টুকরা ছোট কাঠ দিয়ে জ্বলন্ত চিতার ওপর সাতবার আঘাত করার নিয়ম রয়েছে। দাহকার্য সম্পূর্ণরূপে শেষ হওয়ার পর যিনি মুখাগ্নি করেছেন, তিনি সাত কলসি জল এবং উপস্থিত অন্যান্যরা এক এক কলসি জল ঢেলে চিতার আগুন সম্পূর্ণ নিভিয়ে ফেলেন। আগুন নিভিয়ে ফেলার পর চিতা থেকে অদগ্ধ দেহাংশ (অস্থি) এবং ভস্ম অত্যন্ত সতর্কতার সাথে সংগ্রহ করে একটি মাটির পাত্রে রাখা হয়। পরবর্তীতে আত্মার অনন্ত শান্তির কামনায় এই পাত্রটি গঙ্গা বা অন্য কোনো পবিত্র নদী বা জলাশয়ে ভাসিয়ে দেওয়া হয়, যাকে ‘অস্থি বিসর্জন’ বলা হয়। [উৎস: লৌকিক বাংলার প্রথা ও সংস্কৃতি]

শুদ্ধি লাভ ও গৃহে প্রত্যাবর্তন

শ্মশানের কাজ শেষ হওয়ার পর শ্মশানযাত্রীদের শুদ্ধি লাভের জন্য স্নান করা বাধ্যতামূলক। স্নান সেরে ভেজা পোশাকে বা পরিষ্কার পোশাকে তারা বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হন। বাড়িতে প্রবেশের আগে মৃত ব্যক্তির শোক এবং শ্মশানের নেতিবাচক শক্তি দূর করার জন্য বেশ কিছু লৌকিক প্রথা পালন করা হয়। যেমন, নিমপাতা দাঁতে কাটা হয়, যা প্রিয়জন হারানোর শোকের তিক্ততার প্রতীক। এরপর আগুন, লোহা, মটর ডাল প্রভৃতি স্পর্শ করে শুদ্ধ হয়ে তবেই ঘরের ভেতর প্রবেশ করতে হয়। বিভিন্ন অঞ্চলে পাথর, জল, গোবর এবং সাদা সরষে স্পর্শ করার রীতিও প্রচলিত রয়েছে। তবে বর্তমান যুগে মানুষের কর্মব্যস্ততা ও পারিপার্শ্বিক অবস্থার পরিবর্তনের কারণে এই কঠিন নিয়মগুলোর অনেক কিছুই দিনে দিনে সহজ ও শিথিল করা হচ্ছে। [উৎস: বাঙালির সমাজ ও লৌকিক সংস্কৃতি]

দাহকার্যের ব্যতিক্রম ও বিশেষ নিয়ম

হিন্দু সমাজে সাধারণত মৃতদেহ দাহ করা হলেও এর কিছু শাস্ত্রীয় ব্যতিক্রম রয়েছে। সাধু-সন্ন্যাসী বা যাঁরা গৃহত্যাগ করেছেন, তাঁদের ক্ষেত্রে দাহ করা হয় না, কারণ বিশ্বাস করা হয় তাঁরা জীবিত অবস্থাতেই পার্থিব মোহ ত্যাগ করেছেন। তাঁদের ক্ষেত্রে সাধারণত ‘জলসমাধি’ (জলে ভাসিয়ে দেওয়া) বা ‘মৃৎসমাধি’ (মাটিতে সমাধিস্থ করা) দেওয়ার রীতি আছে। এছাড়া শিশু, সাপে কাটা ব্যক্তি, এবং বসন্ত বা কুষ্ঠের মতো বিশেষ কোনো মারাত্মক সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও শবদাহ না করে জলসমাধি বা মৃৎসমাধি দেওয়া হয়। দাহ করার সময় ব্যবহৃত কাঠের ক্ষেত্রেও ভিন্নতা দেখা যায়। অত্যন্ত ধনাঢ্য বা বিশেষ সম্মানিত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে চন্দনকাঠ বা চন্দনগুঁড়া দিয়ে চিতা সাজানো হয়, যা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। তবে সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে এমন কোনো ধরাবাঁধা নিয়ম নেই, তাঁরা সাধারণত আম, বেল বা অন্যান্য সহজলভ্য কাঠ দিয়েই দাহকার্য সম্পন্ন করেন। [উৎস: বাংলাপিডিয়া – বাংলাদেশ জাতীয় জ্ঞানকোষ]