অন্দরকিলা মসজিদ

ভৌগোলিক অবস্থান ও ঐতিহাসিক পটভূমি

অন্দরকিলা মসজিদ বাংলাদেশের বন্দরনগরী চট্টগ্রামের একটি অন্যতম প্রাচীন ও ঐতিহাসিক ধর্মীয় স্থাপনা। চট্টগ্রামের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত ‘অন্দরকিলা’ (যার আভিধানিক অর্থ হলো অভ্যন্তরীণ দুর্গ) নামক একটি উঁচু পাহাড়ের চূড়ায় এই সুদৃশ্য মসজিদটি নির্মিত। ঐতিহাসিকভাবে এটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এটিই চট্টগ্রাম অঞ্চলে মুঘলদের নির্মিত সর্বপ্রথম স্থাপত্যকর্ম। মসজিদের গায়ে স্থাপিত একটি প্রাচীন ফারসি ভাষার শিলালিপি থেকে স্পষ্টভাবে জানা যায় যে, বাংলার তৎকালীন সুবাহদার শায়েস্তা খান ১৬৬৭ খ্রিস্টাব্দে এই মসজিদটি নির্মাণ করেন। তবে ঐতিহাসিকদের মতে, এই মসজিদের প্রকৃত নির্মাতা ছিলেন সুবাহদার শায়েস্তা খানের জ্যেষ্ঠপুত্র এবং চট্টগ্রাম বিজেতা বুজুর্গ উমেদ খান। যদিও মসজিদের শিলালিপিতে তাঁর নামের কোনো প্রত্যক্ষ উল্লেখ পাওয়া যায় না, তবুও মুঘলদের চট্টগ্রাম বিজয়ের স্মারক হিসেবে এই মসজিদটির নির্মাণকাজ তাঁর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানেই সম্পন্ন হয়েছিল বলে প্রবল ধারণা করা হয়। [উৎস: বাংলাপিডিয়া – বাংলাদেশ জাতীয় জ্ঞানকোষ]

অব্যবহার, ব্রিটিশ দখল ও পুনরুদ্ধার

নির্মাণের পর দীর্ঘ সময় ধরে এই মসজিদটি তার মূল উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়নি। ১৭৬১ সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি যখন চট্টগ্রামের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে, তখন ব্রিটিশ সামরিক কর্মকর্তারা কৌশলগত কারণে এই উঁচু পাহাড়ে অবস্থিত মসজিদটিকে তাদের অস্ত্র ও গোলাবারুদের গুদামঘরে (ম্যাগাজিন) রূপান্তর করেন। প্রায় এক শতাব্দী ধরে এটি সামরিক গুদাম হিসেবেই ব্যবহৃত হতে থাকে। পরবর্তীতে, ১৮৫৩ সালে চট্টগ্রামের তৎকালীন শীর্ষস্থানীয় মুসলিম নেতা হামিদুল্লা খানের নেতৃত্বে স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায় মসজিদটিকে পুনরায় ধর্মীয় কাজে ব্যবহারের জন্য ব্রিটিশ সরকারের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে আবেদন ও অনুরোধ জানান। দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর ১৮৫৫ সালে মসজিদটি সামরিক দখল থেকে মুক্ত হয়। সমসাময়িক একটি শিলালিপি থেকে জানা যায় যে, পুনরুদ্ধারের পর মসজিদটিকে সম্পূর্ণরূপে সংস্কার করা হয়েছিল। পাকিস্তান আমলে ক্রমবর্ধমান মুসল্লিদের স্থান সংকুলানের জন্য এর পরিসর ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি করা হয়, যার ফলে মসজিদের আদি অবয়বের অনেকটাই পরিবর্তন হয়ে যায়। ইমারতের এই পরিবর্ধন ও সংস্কার প্রক্রিয়া বর্তমানেও অব্যাহত রয়েছে এবং একসময়ের একতলা মসজিদটি আজ একটি সুবিশাল বহুতলবিশিষ্ট আধুনিক ইমারতে পরিণত হয়েছে। তবে এতবার সংস্কার কাজের পরও মসজিদের মূল আদি কাঠামোটি সযত্নে সংরক্ষিত আছে। [উৎস: বাংলাদেশের ধর্মীয় স্থাপত্য ও ইতিহাস]

বহির্ভাগের স্থাপত্যশৈলী ও গঠনকাঠামো

অন্দরকিলা মসজিদের আদি কাঠামোটি মূলত আয়তাকার। এর ভেতরের দিকের পরিমাপ উত্তর-দক্ষিণে ১৭.০৭ মিটার এবং পূর্ব-পশ্চিমে ৭.৩০ মিটার। মসজিদের মূল কাঠামোর চার কোণায় চারটি অষ্টভুজাকৃতির বিশাল বুরুজ (Tower) ছিল, যার মধ্যে পেছন দিকের (পশ্চিম দিকের) দুটি বুরুজ আজও অক্ষত অবস্থায় বিদ্যমান। এই বুরুজগুলো অনুভূমিক বপ্র বা প্যারাপেট (Parapet) অতিক্রম করে বেশ কিছুটা ওপরের দিকে উঠে গেছে। বুরুজের একেবারে শীর্ষে রয়েছে ক্ষুদ্র গম্বুজসহ নিরেট ছত্রী, যার ওপরে অত্যন্ত নান্দনিক কলসচূড়া শোভা পাচ্ছে। আদি কাঠামোতে মসজিদে প্রবেশের জন্য মোট পাঁচটি খিলানযুক্ত প্রবেশদ্বার ছিল—পূর্বদিকে তিনটি এবং উত্তর ও দক্ষিণ দিকে একটি করে। বর্তমান সময়ে সংস্কারের সুবিধার্থে এই প্রবেশদ্বারগুলোকে আগের তুলনায় অনেক প্রশস্ত করা হয়েছে। পূর্ব দিকের প্রতিটি প্রবেশপথ একটি অর্ধগম্বুজাকৃতির খিলান ছাদের নিচে উন্মুক্ত, যা মুঘল স্থাপত্যের একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য। [উৎস: মুঘল স্থাপত্যবিদ্যা ও প্রত্নতত্ত্ব]

অভ্যন্তরীণ নকশা, খিলান ও মিহরাব

মসজিদের পূর্বদিকের প্রবেশপথ তিনটির ঠিক সমান্তরালে কিবলা দেওয়ালের (পশ্চিম দেওয়াল) ভেতরের অংশে তিনটি মিহরাব স্থাপন করা হয়েছিল। তবে কালক্রমে এর মধ্যে পার্শ্ববর্তী মিহরাব দুটিকে বর্তমানে জানালায় রূপান্তর করা হয়েছে। স্থাপত্যিক নিয়ম অনুযায়ী, মাঝের খিলান পথ এবং মাঝের প্রধান মিহরাবটি সাধারণভাবেই পার্শ্ববর্তী খিলান ও মিহরাবগুলোর চেয়ে আকারে বেশ বড়। এই মাঝের অংশের প্রান্তসীমায় অত্যন্ত শোভাময় ক্ষুদ্র বুরুজসহ বাইরের দিকে একটি অভিক্ষেপ (Projection) রয়েছে। এই ক্ষুদ্র বুরুজগুলো কোণার প্রধান বুরুজগুলোর মতোই মসজিদের ছাদের ওপরে উঠে গেছে এবং এগুলোর মাথায়ও কলসচূড়াসহ ছোট আকারের গম্বুজ স্থাপন করা ছিল। মসজিদের বড় অভ্যন্তরীণ কক্ষটি দুটি প্রশস্ত খিলানের মাধ্যমে তিনটি ‘বে’ (Bay) বা অংশে বিভক্ত। মাঝের ‘বে’টি আকারে বড় এবং বর্গাকৃতির, যার প্রতিটি বাহুর দৈর্ঘ্য ৭.৩২ মিটার। অন্যদিকে পার্শ্ববর্তী প্রতিটি ‘বে’ আয়তাকার, যার পরিমাপ ৭.৩২ মিটার × ৩.৩৫ মিটার। [উৎস: বাংলাপিডিয়া – বাংলাদেশ জাতীয় জ্ঞানকোষ]

গম্বুজ ও ক্রুশাকৃতি খিলান ছাদ

মাঝের বর্গাকার ‘বে’টির ওপরে একটি সুদৃশ্য কেন্দ্রীয় গম্বুজ স্থাপিত। গম্বুজটি একটি বৃত্তাকার পিপা বা ড্রামের (Drum) ওপর বসানো হয়েছে। এই পিপাটি সরাসরি দুটি প্রশস্ত খিলান এবং মাঝের মিহরাব ও মাঝের প্রবেশপথের ওপর নির্মিত বদ্ধ খিলানের (Blind arch) ওপর শক্তভাবে স্থাপিত। কোণাগুলোকে আচ্ছাদিত করার জন্য ক্ষুদ্র অর্ধ-গম্বুজাকৃতি স্কুইঞ্চ (Squinch) ব্যবহার করা হয়েছে। অন্যদিকে, পাশের আয়তাকার ‘বে’গুলোর ছাদ ভেতরের দিক থেকে ক্রুশাকৃতি খিলান ছাদ (Cross-vault) ধরনের। এই প্রতিটি ক্রুশাকৃতি খিলান ছাদের ঠিক মাঝখানে একটি করে ছোট কৃত্রিম গম্বুজ বসানো হয়েছে। এই কৃত্রিম গম্বুজগুলো মসজিদের ভেতর থেকে বোঝা যায় না, এগুলো শুধু বাইরের দিক থেকেই দেখা যায়। বাইরের দিক থেকে দৃশ্যমান এই কৃত্রিম গম্বুজগুলোই মূলত অন্দরকিলা মসজিদটিকে একটি ‘তিন গম্বুজ’ বিশিষ্ট মসজিদের ধ্রুপদী রূপ দিয়েছে। সবকটি গম্বুজের শীর্ষভাগেই মুঘল রীতির স্বাভাবিক পদ্ম ও কলস চূড়া অত্যন্ত দৃষ্টিনন্দনভাবে পরিশোভিত রয়েছে। [উৎস: বাংলার স্থাপত্য ঐতিহ্য]

অলংকরণ ও স্থাপত্যিক তাৎপর্য

দীর্ঘদিনের অযত্ন এবং সংস্কারের কারণে আদি মসজিদের অনেক অলংকরণই আজ আর অবশিষ্ট নেই। পেছন দিকের ছাদ-পাঁচিলে (Parapet) থাকা মেরলোন (Merlon) বা ব্যাটলমেন্ট নকশাকৃত সারি ব্যতীত মসজিদটি তার আদি বাহ্যিক অলংকরণ প্রায় সম্পূর্ণরূপে বর্জিত। এর অভ্যন্তরীণ চারপাশের দেওয়াল এখন আধুনিক ও অত্যন্ত দামি জাপানি টাইলস দ্বারা আবৃত করে দেওয়া হয়েছে, যা এর আদিমতাকে কিছুটা ম্লান করেছে। দেওয়ালের বাইরের দিকের সম্মুখভাগে আস্তর ও চুনকাম করা হয়েছে। তবে মসজিদের পার্শ্ববর্তী আয়তাকার ‘বে’গুলোর ওপর স্থাপিত ক্রুশাকৃতি খিলান ছাদটি স্থাপত্যকলা বিশেষজ্ঞদের কাছে এক বিশেষ আলোচনার বিষয়। মসজিদের এই বিশেষ বৈশিষ্ট্যটি অন্দরকিলা মসজিদের আগে বাংলার কোনো স্থাপত্যে দেখা যায়নি। ঐতিহাসিকদের দৃঢ় বিশ্বাস, এই স্থাপত্যশৈলীটি সরাসরি উত্তর-ভারতের মুঘল স্থাপত্য থেকে এখানে অনুপ্রাণিত হয়ে এসেছে। ঠিক এই ধরনের বৈশিষ্ট্য ফতেহপুর সিক্রিতে অবস্থিত তুর্কি সুলতানার হাম্মামে (Hammam) লক্ষ্য করা যায়। উল্লেখ্য যে, ক্রুশাকৃতির খিলান ছাদ ইরানি স্থাপত্যে বারো শতকের শুরু থেকে প্রচুর পরিমাণে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। সমগ্র মুসলিম স্থাপত্যে এই বৈশিষ্ট্যের প্রাথমিক দুটি নিদর্শন পাওয়া যায় ‘কুসির অমর’ (আনুমানিক ৭১৪ খ্রিস্টাব্দ) এবং রাক্কা নগরে অবস্থিত ‘বাগদাদ তোরণে’। অন্দরকিলা মসজিদ তাই কেবল একটি উপাসনালয় নয়, এটি বাংলার বুকে মুঘল ও মধ্যপ্রাচ্যের স্থাপত্যকলার এক অনবদ্য ঐতিহাসিক সেতুবন্ধন। [উৎস: বাংলাপিডিয়া – বাংলাদেশ জাতীয় জ্ঞানকোষ]