লর্ড কর্নওয়ালিস (শাসনকাল: ১৭৮৬–১৭৯৩ এবং ১৮০৫ খ্রিস্টাব্দ) ছিলেন ব্রিটিশ ভারতের ইতিহাসের অন্যতম প্রভাবশালী গভর্নর-জেনারেল। ওয়ারেন হেস্টিংস ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের যে প্রশাসনিক ভিত্তি তৈরি করেছিলেন, কর্নওয়ালিস তাঁর সুশৃঙ্খল ও যুগান্তকারী সংস্কারের মাধ্যমে তাকে একটি শক্ত ও স্থায়ী রূপ দেন। ভারতের আধুনিক সিভিল সার্ভিস, পুলিশ ব্যবস্থা এবং বিচারব্যবস্থার মূল কাঠামো তাঁর হাত ধরেই তৈরি হয়েছিল। তবে বাংলার ইতিহাসে তিনি সবচেয়ে বেশি স্মরণীয় হয়ে আছেন তাঁর প্রবর্তিত ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত’-এর জন্য।
১. চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত (Permanent Settlement – ১৭৯৩)
কর্নওয়ালিসের সবচেয়ে আলোচিত এবং সুদূরপ্রসারী অর্থনৈতিক পদক্ষেপ ছিল ১৭৯৩ সালে প্রবর্তিত ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত’।
-
মূল নীতি: এই ব্যবস্থায় জমিদারদের জমির স্থায়ী মালিকানা প্রদান করা হয়। শর্ত ছিল, তারা ব্রিটিশ সরকারকে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ রাজস্ব (সূর্যাস্ত আইন অনুযায়ী নির্দিষ্ট দিনে সূর্য ডোবার আগে) প্রদান করবে।
-
উদ্দেশ্য ও ফলাফল: ব্রিটিশদের উদ্দেশ্য ছিল একটি অনুগত জমিদার শ্রেণি তৈরি করা এবং কোম্পানির আয় নির্দিষ্ট করা। এর ফলে জমিদাররা লাভবান হলেও, বাংলার কৃষকরা তাদের জমির চিরস্থায়ী অধিকার হারায় এবং জমিদারদের দয়ার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। বাংলার গ্রামীণ অর্থনীতিতে এর প্রভাব ছিল ভয়াবহ।
২. প্রশাসনিক সংস্কার ও সিভিল সার্ভিস
লর্ড কর্নওয়ালিসকে ‘ভারতের সিভিল সার্ভিসের জনক’ (Father of Civil Service in India) বলা হয়।
-
দুর্নীতি দমন: তিনি কোম্পানির কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত বাণিজ্য কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেন। দুর্নীতি বন্ধ করতে তিনি কর্মকর্তাদের বেতন উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি করেন, যাতে তারা সততার সাথে কাজ করতে পারে।
-
দক্ষ প্রশাসন: তিনি প্রশাসনের বাণিজ্যিক শাখা এবং শাসনতান্ত্রিক শাখাকে সম্পূর্ণ আলাদা করে একটি সুশৃঙ্খল আমলাতন্ত্রের জন্ম দেন।
৩. বিচার ও পুলিশি সংস্কার (Cornwallis Code)
১৭৯৩ সালে তিনি ‘কর্নওয়ালিস কোড’ বা আইনবিধি প্রণয়ন করেন, যা আধুনিক বিচারব্যবস্থার ভিত্তি স্থাপন করে।
-
ক্ষমতার স্বতন্ত্রীকরণ: তিনি জেলা কালেক্টরদের হাত থেকে বিচারবিভাগীয় ক্ষমতা কেড়ে নেন। রাজস্ব আদায় এবং বিচারব্যবস্থাকে তিনি সম্পূর্ণ আলাদা করেন।
-
আদালত স্থাপন: জেলা পর্যায়ে দেওয়ানি আদালত এবং তার ওপরে আপিল আদালত (Provincial Courts of Appeal) স্থাপন করেন।
-
পুলিশ ব্যবস্থা: জমিদারদের পুলিশি দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিয়ে তিনি আধুনিক থানা ব্যবস্থা চালু করেন। প্রতিটি জেলাকে কয়েকটি থানায় ভাগ করে সেখানে ‘দারোগা’ নিয়োগ করেন, যারা সরাসরি জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের অধীনে কাজ করত।
৪. ভারতীয়দের প্রতি বৈষম্যমূলক নীতি
কর্নওয়ালিসের শাসনের একটি বড় কলঙ্কজনক দিক ছিল ভারতীয়দের প্রতি তাঁর চরম বর্ণবাদী ও বৈষম্যমূলক দৃষ্টিভঙ্গি।
-
তিনি বিশ্বাস করতেন যে “প্রতিটি ভারতীয়ই দুর্নীতিগ্রস্ত”।
-
এই ধারণার বশবর্তী হয়ে তিনি প্রশাসনের সমস্ত উচ্চপদ (সিভিল, বিচার ও সামরিক) থেকে ভারতীয়দের সম্পূর্ণভাবে বাদ দেন। ভারতীয়দের জন্য কেবল কেরানি বা অত্যন্ত নিম্নস্তরের পদগুলো বরাদ্দ রাখা হয়েছিল।
৫. সামরিক সাফল্য: তৃতীয় মহীশূর যুদ্ধ (১৭৯০-১৭৯২)
সামরিক দিক থেকেও কর্নওয়ালিস অত্যন্ত দক্ষ ছিলেন (যদিও তিনি আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধে জর্জ ওয়াশিংটনের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিলেন)। ভারতে তিনি মহীশূরের পরাক্রমশালী শাসক টিপু সুলতানের বিরুদ্ধে তৃতীয় মহীশূর যুদ্ধে নেতৃত্ব দেন। এই যুদ্ধে টিপু সুলতান পরাজিত হন এবং ১৭৯২ সালের ‘শ্রীরঙ্গপত্তনমের সন্ধি’ অনুযায়ী তাঁর রাজ্যের অর্ধেক অংশ এবং বিশাল ক্ষতিপূরণ ব্রিটিশদের হাতে তুলে দিতে বাধ্য হন।
ঐতিহাসিক মূল্যায়ন
১৮০৫ সালে দ্বিতীয়বারের জন্য গভর্নর-জেনারেল হয়ে ভারতে আসার পর কিছুদিনের মধ্যেই উত্তরপ্রদেশের গাজিপুরে তিনি মৃত্যুবরণ করেন এবং সেখানেই তাঁকে সমাহিত করা হয়।
ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে কর্নওয়ালিস একজন সৎ, সুশৃঙ্খল এবং দূরদর্শী প্রশাসক ছিলেন, যিনি ভারতে ব্রিটিশ শাসনকে স্থায়িত্ব দিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর প্রবর্তিত চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত বাংলার কৃষকদের সর্বস্বান্ত করেছিল এবং বর্ণবাদী নীতির মাধ্যমে ভারতীয়দের যোগ্যতা ও আত্মমর্যাদাকে তিনি চরমভাবে অপমানিত করেছিলেন।