অনশন

অনশন বা উপবাস হলো স্বেচ্ছায় খাদ্য ও পানীয় গ্রহণ থেকে বিরত থাকা। এটি কোনো সাধারণ শারীরিক ক্ষুধা নয়, বরং এটি একটি আত্মিক ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়া। খাদ্যাভাবে যে উপবাস, তা অনশন নয়; কারণ তা মানুষের দারিদ্র্য ও আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতির বহিঃপ্রকাশ, যা অনাকাঙ্ক্ষিত ও বাধ্যতামূলকের পর্যায়ে পড়ে। অনশন হলো একটি সচেতন ও পরিকল্পিত সিদ্ধান্ত, যার পেছনে থাকে সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য, আদর্শ এবং নৈতিক দৃঢ়তা। একজন ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যখন তাদের অন্তরের দাবিকে বিশ্বের দরবারে অত্যন্ত শক্তিশালী ও জোরালোভাবে তুলে ধরতে চান, তখন অনশনকে শেষ হাতিয়ার হিসেবে বেছে নেন।

অনশনের ঐতিহাসিক ও দার্শনিক ভিত্তি অত্যন্ত গভীর। প্রাচীন ও মধ্যযুগে প্রায় সব ধর্মের আচার-অনুষ্ঠানে অনশনের বিধান ছিল। হিন্দু ধর্মে পূজা-পার্বণ, প্রায়শ্চিত্ত বা কোনো আধ্যাত্মিক ব্রত অর্জনের জন্য আমৃত্যু অনশন করার প্রথা বিশেষভাবে প্রচলিত। বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মেও কঠোর তপস্যা ও আত্মশুদ্ধির মাধ্যম হিসেবে অনশনকে দেখা হয়। মূলত প্রাচীনকালে ধর্মীয় তপস্যা বা পাপ মোচনের পথ হিসেবে অনশনকে দেখা হতো। পরবর্তীতে এই ধর্মীয় অনশনের দর্শনেই রাজনৈতিক অনশনের মূল ভিত্তি প্রোথিত হয়। দক্ষিণ এশিয়ায় এই অনশনকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে প্রথম ব্যাপকভাবে জনপ্রিয় করে তোলেন মহাত্মা গান্ধী। তাঁর ‘সত্যাগ্রহ’ দর্শনের মূল কথা ছিল—যখন কোনো সৎ শক্তি অশুভ শক্তির কাছে পরাভূত হয়, তখন অনশনের মাধ্যমে অসৎ শক্তির বিবেককে জাগ্রত করা সম্ভব। গান্ধীজি বিশ্বাস করতেন, অনশন কেবল নিজের দুঃখভোগ নয়, বরং এর মাধ্যমে সমাজের নিষ্ক্রিয় শক্তিকে সক্রিয় করা যায় এবং প্রতিপক্ষের হৃদয়ে অনুশোচনা সৃষ্টি করা যায়।

অনশনের প্রভাব বহুমুখী। গান্ধীজি তাঁর সারা জীবনে হিন্দু-মুসলিম সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, অস্পৃশ্যতা দূরীকরণ এবং ব্রিটিশ সরকারের অন্যায্য আইনবিধির বিরুদ্ধে বহুবার অনশন করেছেন। অনশন কেবল প্রতিপক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টি করেনি, বরং এটি সমাজকে নৈতিকভাবে জাগ্রত করেছে। আমাদের উপমহাদেশের ইতিহাসে মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর মতো নেতৃত্বও অনশনকে জনগণের ন্যায্য দাবি আদায়ের উপায় হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। পাকিস্তান আমল থেকে শুরু করে স্বাধীন বাংলাদেশেও বিভিন্ন সময় নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ তাদের দাবি আদায়ে অনশন পালন করেছেন। এই অনশনগুলো প্রমাণ করে যে, শারীরিক শক্তির চেয়েও ইচ্ছাশক্তি ও নৈতিক শক্তির প্রভাব অনেক বেশি। অনশনকারীর জীবন সংশয় সরাসরি শাসকের বা কর্তৃপক্ষের বিবেককে নাড়া দেয়, যা অনেক সময় আলোচনার টেবিল থেকে বড় বড় দাবি আদায় করে নিতে সক্ষম হয়।

অনশনকে সাধারণত তার তীব্রতা অনুযায়ী তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়। প্রথমত, স্বল্পানশন, যা নির্দিষ্ট কিছু খাদ্য গ্রহণ না করে আংশিক উপবাস। দ্বিতীয়ত, অর্ধানশন, যেখানে সীমিত পরিমাণে আহার করে উপবাস পালন করা হয়। তৃতীয়ত, পূর্ণানশন, যা কোনো ধরনের খাদ্য বা পানীয় গ্রহণ না করে সম্পূর্ণ অনাহার পালন করা। এই ভিন্নতাগুলো পরিস্থিতির গুরুত্ব ও অনশনকারীর দৃঢ়তার ওপর নির্ভর করে। তবে যেকোনো প্রকার অনশনই মূলত একটি অহিংস প্রতিবাদের রূপ।