নাট্যগোষ্ঠী বা থিয়েটার গ্রুপ হলো মঞ্চনাটক পরিবেশনের উদ্দেশ্যে গঠিত একটি সুসংগঠিত সাংস্কৃতিক সংগঠন। মঞ্চনাটক কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়, এটি সমাজজীবনের নানা অসঙ্গতি, ইতিহাস, রাজনীতি এবং দর্শনের এক জীবন্ত দলিল। নাট্যগোষ্ঠীর মাধ্যমেই একজন নাট্যকার, নির্দেশক এবং অভিনেতার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একটি কাল্পনিক বা বাস্তব কাহিনী দর্শকদের সামনে জীবন্ত হয়ে ওঠে। একটি নাট্যগোষ্ঠী কেবল নাটক মঞ্চায়ন করে না, বরং এটি নতুন নাট্যকর্মী তৈরির এক অনন্য প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হিসেবেও কাজ করে। মঞ্চের আলো-ছায়া, শব্দ এবং অভিনয়ের সূক্ষ্ম কারুকার্যে জীবনের সত্যগুলোকে তুলে ধরাই নাট্যগোষ্ঠীর মূল লক্ষ্য।
বাংলাদেশে নাট্যচর্চার বিবর্তন ও ইতিহাস অত্যন্ত সমৃদ্ধ এবং সংগ্রামের আখ্যান। ১৭৯৫ সালে হেরাসিম লেবেডেভ কর্তৃক কলকাতায় ‘বেঙ্গলী থিয়েটার’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাংলা নাট্যচর্চার যে বীজ বপন করা হয়েছিল, তা পরবর্তীতে প্রবল শক্তিতে বিকশিত হয়। কলকাতা কেন্দ্রিক এই থিয়েটার আন্দোলনের ছোঁয়া খুব দ্রুতই তৎকালীন বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের আগে ঢাকা ও বাংলাদেশের অন্যান্য জেলায় নাট্যচর্চাকে টিকিয়ে রাখার জন্য স্থানীয় নাট্যামোদী ব্যক্তিরা বিভিন্ন সংগঠন গড়ে তোলেন। এর মধ্যে ১৮৮৮ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘ইলিশিয়াম থিয়েটার’, ১৮৯০ সালে ‘ক্রাউন থিয়েটার’, ১৯০০ সালে ‘খুলনা থিয়েটার’, ১৯১১ সালে টাঙ্গাইলের ‘করোনেশন ড্রামাটিক ক্লাব’ এবং ১৯১৩ সালের ‘দিনাজপুর নাট্য সমিতি’ অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য। এই সংগঠনগুলোই মূলত বাংলা নাটকের ভিত্তি গড়ে দিয়েছিল এবং ঔপনিবেশিক শাসনামলেও সাংস্কৃতিক স্বকীয়তা বজায় রেখেছিল।
১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর পাকিস্তান আমলে যখন সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বাঙালি প্রতিবাদী হয়ে ওঠে, তখন নাট্যচর্চা হয়ে ওঠে প্রতিরোধের এক শক্তিশালী হাতিয়ার। ১৯৫২ সালে ‘হাবিব প্রডাকসন্স’, ১৯৫৫ সালে ‘ড্রামা সার্কেল’ এবং ১৯৬৯ সালে বরিশালের ‘খেয়ালী গ্রুপ থিয়েটার’ নাট্যচর্চায় নতুন মাত্রা যোগ করে। কিন্তু ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতার পর নাট্যগোষ্ঠীর সংখ্যা বিস্ফোরক হারে বৃদ্ধি পায়। স্বাধীনতার চেতনাকে ধারণ করে ঢাকা থেকে শুরু করে দেশের প্রত্যন্ত গ্রামেও নাট্যদলের জয়যাত্রা শুরু হয়, যা নাট্যচর্চার গতিকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে নাট্যগোষ্ঠীগুলো কেবল শিল্পের চর্চা করেনি, বরং দেশের পুনর্গঠন এবং মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ বাস্তবায়নেও ভূমিকা রেখেছে।
নাট্যগোষ্ঠী সমাজের ‘দর্পণ’ হিসেবে কাজ করে। তাদের পরিবেশনায় উঠে আসে সামাজিক সচেতনতা, যেখানে অভিনয়ের মাধ্যমে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানো এবং সাধারণ মানুষকে সচেতন করে তোলা হয়। পাশাপাশি এটি নিজস্ব সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের চর্চা ও সংরক্ষণে কাজ করে, যা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে অমূল্য সম্পদ হিসেবে পৌঁছায়। নাট্যচর্চার মাধ্যমে অভিনেতা ও কুশলীরা যে প্রতিভা বিকাশের সুযোগ পান, তা তাদের সৃজনশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে। এছাড়া, সমসাময়িক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও জনমতের প্রকাশ ঘটানোতেও নাট্যগোষ্ঠীগুলোর সাহসী ভূমিকা সবসময় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে।