অটোট্রফ

অটোট্রফ (Autotroph) বা স্বভোজী হলো এমন একদল অনন্য জীব, যারা বাইরের কোনো জৈব উৎস থেকে খাদ্য গ্রহণ না করে বরং নিজের খাদ্য নিজেই তৈরি করতে সক্ষম। শব্দটির ব্যুৎপত্তিগত অর্থই হলো ‘স্বয়ংসম্পূর্ণ ভোজী’। এই জীবেরা মূলত সূর্য থেকে প্রাপ্ত শক্তি কিংবা বিভিন্ন অজৈব রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে শক্তি আহরণ করে এবং কার্বন ডাই-অক্সাইড (CO2) ব্যবহার করে জটিল জৈব অণু বা খাদ্য তৈরি করে। অটোট্রফ বা স্বভোজীদের এই প্রক্রিয়ার ওপরই পৃথিবীর পুরো জৈবিক বিশ্বের খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থা টিকে আছে। এদের প্রধানত দুটি ভাগে ভাগ করা যায়: সালোকসংশ্লেষী এবং রাসায়নিক সংশ্লেষণকারী। উদ্ভিদ, শৈবাল এবং বিভিন্ন ধরনের ব্যাকটেরিয়ার একটি বড় অংশ সালোকসংশ্লেষণের মাধ্যমে সরাসরি সূর্যরশ্মি থেকে শক্তি গ্রহণ করে।

সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় স্বভোজীরা বায়ুমণ্ডল থেকে CO2 এবং পানির (H2O) অণু থেকে হাইড্রোজেন আহরণ করে শর্করা বা কার্বোহাইড্রেট উৎপন্ন করে। এই প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করার জন্য ক্লোরোফিলযুক্ত কোষ এবং পর্যাপ্ত সূর্যালোক অপরিহার্য। ক্লোরোফিল সূর্যের আলোক শক্তিকে রাসায়নিক শক্তিতে রূপান্তরিত করে, যা উদ্ভিদের টিস্যুতে সঞ্চিত হয়। এভাবে স্বভোজীরা কেবল নিজেদের জীবনধারণের রসদই সংগ্রহ করে না, বরং পুরো খাদ্যশৃঙ্খলের জন্য প্রাথমিক শক্তির উৎস বা ‘প্রাথমিক উৎপাদক’ (Primary Producer) হিসেবে কাজ করে। এই উৎপাদকদের ওপর ভিত্তি করেই তৃণভোজী এবং পরবর্তীতে মাংসাশী প্রাণীদের জীবনচক্র আবর্তিত হয়।

অন্যদিকে, রাসায়নিক সংশ্লেষণ বা কিমোসিন্থেসিস (Chemosynthesis) এক অত্যন্ত বিস্ময়কর প্রক্রিয়া, যা কিছু বিরল স্বভোজী জীবের দ্বারা সম্পন্ন হয়। সূর্যালোক পৌঁছাতে পারে না এমন দুর্গম ও অন্ধকার পরিবেশে, যেমন—গভীর সমুদ্রের হাইড্রোথার্মাল ভেন্ট (Hydrothermal Vents), সমুদ্রতলদেশের কোল্ড সিপস (Cold Seeps), কিংবা তিমির মৃতদেহের আশেপাশে যেসব অটোট্রফ বাস করে, তারা এই পদ্ধতি ব্যবহার করে। এসব জীব সাধারণত হাইড্রোজেন সালফাইড (H2S) বা মিথেন (CH4) এর সাথে অক্সিজেনের রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটিয়ে শক্তি উৎপাদন করে খাদ্য তৈরি করে। উদাহরণস্বরূপ, গভীর সমুদ্রের আগ্নেয়গিরির কাছাকাছি বাস করা ব্যাকটেরিয়াগুলো সালফার বা হাইড্রোজেন সালফাইডের জারণ ঘটিয়ে বেঁচে থাকে। এদের এই অসাধ্য সাধনের ক্ষমতা প্রমাণ করে যে, জীবনের বিকাশ কেবল সূর্যালোকের ওপরই নির্ভরশীল নয়।