অড়হর

অড়হর (Pigeon Pea), যার বৈজ্ঞানিক নাম Cajanus cajan, লেগুমিনোসি (Leguminosae) গোত্রের অন্তর্ভুক্ত একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ডালজাতীয় ফসল। এটি মূলত একটি শক্তপোক্ত ও দীর্ঘস্থায়ী গুল্মজাতীয় উদ্ভিদ, যা সাধারণত ১ থেকে ৪ মিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। যদিও কিছু ক্ষেত্রে এটি বর্ষজীবী উদ্ভিদ হিসেবে জন্মায়, তবে এটি কয়েক বছর স্থায়ী হতে সক্ষম। অড়হরের ফুল সাধারণত হলুদ বর্ণের হয় এবং পরিপক্ক পাতাগুলো হালকা বাদামি রঙের হয়ে থাকে। এর বীজ সাদা বা তামাটে সাদা রঙের হয়। বাংলাদেশে অড়হর চাষের এক সুদীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। সাধারণত বসতবাড়ির আঙিনায়, ফসলি জমির সীমানায় বা রাস্তার ধারে গৌণ ফসল হিসেবে সনাতন পদ্ধতিতে এর চাষাবাদ করা হয়। দেশের কুষ্টিয়া, রংপুর, দিনাজপুর ও যশোর জেলায় অড়হরের চাষ সবচেয়ে বেশি পরিলক্ষিত হয়। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ৫,২১৫ একর জমিতে অড়হরের চাষ হচ্ছে এবং বার্ষিক উৎপাদনের পরিমাণ প্রায় ১,০০৫ মেট্রিক টন।

অড়হরের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর খরা সহনশীলতা। এই উদ্ভিদের শিকড় মাটির অনেক গভীরে প্রবেশ করতে পারে, যার ফলে অর্ধ-শুষ্ক আবহাওয়া এবং বছরে মাত্র ৬৫ সেন্টিমিটার বৃষ্টিপাতেও এটি চমৎকারভাবে বেড়ে উঠতে পারে। তবে অতিরিক্ত আর্দ্র বা জলাবদ্ধ জমি এই ফসলের জন্য উপযোগী নয়। প্রায় সব ধরনের মাটিতেই অড়হর জন্মাতে পারে, তবে মাটিতে যদি চুনের পরিমাণ খুব বেশি কম থাকে, তবে তা চাষাবাদের জন্য বাঞ্ছনীয় নয়। সাধারণত একটি অড়হর গাছ থেকে ফলন পেতে প্রায় ৩০০ দিনের মতো সময় প্রয়োজন হয়।

অড়হরের ব্যবহার বহুমুখী। এর কচি সবুজ বীজ সবজি হিসেবে এবং পাকা শুকনো বীজ ডাল হিসেবে অত্যন্ত জনপ্রিয় ও পুষ্টিকর। ডাল হিসেবে অড়হর আমাদের আমিষের চাহিদার একটি বড় অংশ পূরণ করে। শুধুমাত্র মানুষের খাদ্য হিসেবেই নয়, অড়হর গবাদি পশুর জন্যও দারুণ উপকারী। ফলসহ উদ্ভিদের আগা বা ডগা পশুখাদ্য হিসেবে উৎকৃষ্ট এবং এটি দিয়ে খড় ও সবুজ পশুখাদ্য তৈরি করা সম্ভব। কৃষিকাজে এর বহুমুখী ভূমিকা রয়েছে; এটি ছাউনি ফসল (Cover Crop), সবুজ সার এবং ক্ষেতের চারপাশ দিয়ে বাতাসের গতি রোধক (Windbreak) হিসেবেও কৃষকরা ব্যবহার করে থাকেন।