অজৈব নিয়ামক

অজৈব নিয়ামক বা অ্যাবায়োটিক স্ট্রেস (Abiotic Stress) বর্তমান সময়ের কৃষিবিজ্ঞান ও উদ্ভিদবিদ্যার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও আলোচিত বিষয়। যেহেতু উদ্ভিদ তার শিকড়ের মাধ্যমে মাটির সাথে দৃঢ়ভাবে আবদ্ধ থাকে, তাই স্থান পরিবর্তনের কোনো সুযোগ তাদের নেই। এই অচল স্বভাবের কারণে পরিবেশগত যেকোনো ধরনের বিপর্যয় বা বিরূপ পরিস্থিতি দ্বারা উদ্ভিদ ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হয়। সহজ কথায়, উদ্ভিদ যখন তার স্বাভাবিক বৃদ্ধি, বিকাশ কিংবা ফলন নিশ্চিত করার জন্য অনুকূল পরিবেশ পায় না এবং পারিপার্শ্বিক ভৌত-রাসায়নিক পরিবর্তনগুলোর কারণে তার শারীরবৃত্তীয় কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটে, তখন সেই অবস্থাকেই ‘অজৈব নিয়ামকের প্রভাব’ বা অ্যাবায়োটিক স্ট্রেস বলা হয়। এই স্ট্রেসগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো অতিরিক্ত তাপ বা অসহনীয় ঠান্ডা, মাটির অতিরিক্ত লবণাক্ততা, দীর্ঘস্থায়ী খরা, বন্যা বা জলাবদ্ধতা, মাটিতে প্রয়োজনীয় খনিজ উপাদানের ঘাটতি বা আধিক্য, এবং অপর্যাপ্ত বা অত্যধিক আলো। এমনকি বায়ুমণ্ডলে ওজোন গ্যাসের উপস্থিতি বা অস্বাভাবিকতাও উদ্ভিদের জন্য বিষাক্ত হতে পারে। উদ্ভিদের ওপর এই চাপের প্রভাব কতটা তীব্র হবে, তা মূলত নির্ভর করে উদ্ভিদটি তার জীবনচক্রের কোন পর্যায়ে রয়েছে, চাপের তীব্রতা কতটুকু এবং কত দীর্ঘ সময় ধরে সেই প্রতিকূল পরিস্থিতি বিরাজ করছে তার ওপর।

অ্যাবায়োটিক স্ট্রেসের কারণে উদ্ভিদের ভেতরে বহুমুখী প্রতিক্রিয়া পরিলক্ষিত হয়। এই চাপের মোকাবিলায় উদ্ভিদের জিনগত প্রকাশে (Gene Expression) ব্যাপক পরিবর্তন আসে এবং কোষীয় ও বিপাকীয় প্রক্রিয়ায় আমূল রূপান্তর ঘটে। কিছু স্ট্রেসের ক্ষেত্রে উদ্ভিদ তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেখাতে সক্ষম হয়, যেমন, খরার সময় পানির অভাব হলে উদ্ভিদের পত্ররন্ধ্র বন্ধ করে দেওয়া বা বৃদ্ধি স্তিমিত করে দেওয়া। আবার কিছু স্ট্রেসের প্রভাব হয় পরোক্ষ এবং দীর্ঘমেয়াদী; যেমন, দীর্ঘদিন লবণাক্ত বা খরা পরিস্থিতির কবলে থাকলে কোষঝিল্লির অখণ্ডতা নষ্ট হয়ে যায়, যা উদ্ভিদের মৃত্যু পর্যন্ত ডেকে আনতে পারে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, স্ট্রেসের তীব্রতা ও স্থায়ীত্বের হেরফেরের কারণে বৈশ্বিক ফসলের উৎপাদনশীলতা প্রায় ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পেতে পারে, যা ক্রমবর্ধমান বিশ্ব জনসংখ্যার খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পথে একটি বিশাল অন্তরায়। এই ভয়াবহ পরিস্থিতির মোকাবিলায় জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে পারে এমন ‘চাপ সহনশীল’ ফসলের জাত উদ্ভাবন করা এখন সময়ের দাবি।

চাপ সহনশীল ফসল উদ্ভাবনের লক্ষ্যে বর্তমানে প্রচলিত প্রজনন পদ্ধতির পাশাপাশি আধুনিক জৈব প্রযুক্তিগত কৌশলের (Biotechnological Strategy) প্রয়োগ বাড়ানো হচ্ছে। তবে যেকোনো সফল ফসল উন্নয়ন কর্মসূচি বা জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং প্রকল্পের জন্য এমন সব ‘দাতা উদ্ভিদের’ (Donor Plant) প্রয়োজন, যাদের মধ্যে প্রতিকূল পরিবেশ সহ্য করার সহজাত সক্ষমতা রয়েছে। এই ধরনের দাতা উদ্ভিদের উৎস হিসেবে চিরাচরিত দেশীয় বা বন্য জাতের উদ্ভিদগুলোকে বেছে নেওয়া সবচেয়ে বুদ্ধিদীপ্ত সিদ্ধান্ত হতে পারে। এসব স্থানীয় জাত যুগ যুগ ধরে প্রতিকূল পরিবেশের সাথে লড়াই করে টিকে আছে এবং বিবর্তনের ধারায় তারা প্রকৃতির বিরূপতা সহ্য করার বিশেষ ক্ষমতা অর্জন করেছে। এই উপলব্ধি থেকেই বর্তমানে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত হয়েছে। বীজ বা জিন ব্যাংকে এই ধরনের মূল্যবান বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন উদ্ভিদের বীজ সংরক্ষণ করা হচ্ছে যাতে ভবিষ্যতে প্রয়োজন অনুযায়ী তাদের জিন ব্যবহার করা যায়।

এই মহৎ উদ্যোগের একটি বড় উদাহরণ হলো সিজিআইএআর (CGIAR) বা আন্তর্জাতিক কৃষি গবেষণা বিষয়ক পরামর্শক দল। তারা বিশ্বজুড়ে এগারোটি জিন ব্যাংক পরিচালনা করছে, যেখানে ৭০,০০০-এরও বেশি শস্য, শাকসবজি, ঘাস এবং অন্যান্য উদ্ভিদ প্রজাতির বীজ সংরক্ষিত রয়েছে। এই ভাণ্ডারে সংরক্ষিত উদ্ভিদগুলোর অনেকগুলোই বাণিজ্যিকভাবে প্রচলিত ফসলের বন্য আত্মীয় বা জংলি জাত, যা হয়তো সাধারণ চোখে গুরুত্বহীন মনে হতে পারে, কিন্তু ভবিষ্যতে হয়তো এটাই হবে খাদ্য সংকটের সমাধান। এখন পর্যন্ত সিজিআইএআর-এর এই কেন্দ্রসমূহ থেকে ১৫০টিরও বেশি দেশের উদ্ভিদ প্রজননকারী এবং গবেষকদের কাছে আনুমানিক দশ লাখেরও বেশি নমুনা বিতরণ করা হয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে, বিজ্ঞানীদের নিরলস প্রচেষ্টা এবং প্রকৃতির অমূল্য ভাণ্ডারকে সঠিকভাবে কাজে লাগানোর মাধ্যমেই আমরা আগামী দিনের জলবায়ু পরিবর্তনজনিত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে সক্ষম হব। অজৈব নিয়ামক কেবল একটি উদ্ভিদতাত্ত্বিক সমস্যা নয়, বরং এটি মানবসভ্যতার টিকে থাকার সংগ্রামের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ, যেখানে বিজ্ঞান ও প্রকৃতি হাতে হাত রেখে আমাদের আগামীর খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পথ দেখাচ্ছে।