অজগর বা পাইথন (Python) হলো সরীসৃপ জগতের অন্যতম রহস্যময় ও বিস্ময়কর প্রাণী। এটি মূলত ‘সার্পেনটিস’ (Serpentes) বর্গের অন্তর্গত ‘বোয়েডি’ (Boidae) গোত্রের অন্তর্ভুক্ত একটি নির্বিষ প্রজাতির সাপ। পৃথিবীতে এ পর্যন্ত অজগরের ৯টি ভিন্ন প্রজাতি চিহ্নিত করা হয়েছে, যাদের মূল আবাসস্থল হিসেবে আফ্রিকা, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, নিউগিনি এবং অস্ট্রেলিয়াকে ধরা হয়। অজগরকে অন্যান্য সাপের থেকে, বিশেষ করে ‘বোয়া’ সাপ থেকে আলাদা করার জন্য এদের করোটির বিশেষ গঠন এবং প্রজনন পদ্ধতিকে প্রধান মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহার করা হয়। অজগর মূলত তার প্রকাণ্ড আকৃতির জন্য পরিচিত। অন্য যেকোনো সাপের তুলনায় এদের দেহের ব্যাস এবং দৈর্ঘ্যের অনুপাত অনেক বেশি, যা এদের শারীরিক গঠনকে বেশ শক্তিশালী ও ভারী করে তোলে। এদের দেহের ত্বক মসৃণ আঁশ দ্বারা আবৃত এবং যদিও এদের দাঁত অত্যন্ত ধারালো ও শক্তিশালী, তবুও কোনো বিষদাঁত না থাকায় এরা শিকারকে বিষ প্রয়োগে নয়, বরং শারীরিক শক্তির মাধ্যমে কাবু করে। এদের স্পষ্ট গ্রীবা, প্রশস্ত মস্তক এবং দীর্ঘ তুন্ড বা মুখমণ্ডল এদের শিকারী স্বভাবের উপযুক্ত বৈশিষ্ট্য প্রদান করে।
অজগর মূলত আধা-বৃক্ষবাসী প্রাণী এবং এদের ঘন বনজঙ্গলে বেশি দেখা যায়। তবে শিকারের সন্ধানে বা বিশ্রামের প্রয়োজনে এরা নদী, হাওর বা জলাশয়ের কাছাকাছি থাকতে পছন্দ করে। এরা পানিতে বেশ দক্ষ সাঁতারু এবং ঘণ্টার পর ঘণ্টা পানির নিচে স্থিরভাবে অবস্থান করতে পারে। অনেক সময় পানির কিনারায় তুন্ড বা নাসিকাটি পানির উপরে রেখে এরা আংশিক বা সম্পূর্ণ ডুব দিয়ে শিকারের জন্য অপেক্ষা করে। মজার বিষয় হলো, ‘অজ’ শব্দের অর্থ ছাগল বা মেষ, আর লোকমুখে প্রচলিত আছে যে এই সাপ যেহেতু বিশাল আকৃতির প্রাণীদের—যেমন ছাগল বা মেষ—শিকার করতে পারে, তাই স্থানীয়ভাবে এদের নাম দেওয়া হয়েছে ‘অজগর’। বাংলাদেশে দুই প্রজাতির অজগর পাওয়া যায়; একটি হলো ময়াল সাপ (Rock Python), যার বৈজ্ঞানিক নাম Python molurus এবং অন্যটি গোলবাহার (Reticulated Python), যার বৈজ্ঞানিক নাম Python reticulata। এর মধ্যে ময়াল সাপ আকারে সবচেয়ে বড় হয় এবং লম্বায় ৫.৭ মিটার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় মিশ্র-চিরহরিৎ বন ও সুন্দরবনের মতো গরান বনাঞ্চলে এদের বিচরণ দেখা যায়। তবে অত্যন্ত দুঃখজনক যে, আবাসস্থল ধ্বংস ও চোরাকারবারিদের দৌরাত্ম্যে বাংলাদেশে উভয় প্রজাতিই বর্তমানে বিরল এবং বিপন্ন বা অতি বিপন্ন হিসেবে গণ্য হয়।
খাদ্যাভ্যাসের দিক থেকে অজগর খুবই বৈচিত্র্যময়। এরা স্তন্যপায়ী প্রাণী, পাখি এবং বিভিন্ন সরীসৃপ নির্বিচারে ভক্ষণ করে। তবে এদের পছন্দের শীর্ষে থাকে বিভিন্ন স্তন্যপায়ী প্রাণী যেমন—ইঁদুর, খরগোশ, ছাগল, ভেড়া, শিয়াল এবং হরিণ। শিকার করার সময় অজগর তার বিশাল দেহের মাংসপেশি ব্যবহার করে শিকারকে পেঁচিয়ে ধরে এবং শ্বাসরুদ্ধ করে মেরে ফেলে, যা এদের অনন্য শিকারি কৌশল। এরপর এরা আস্ত শিকারটি গিলে ফেলে। প্রজনন ঋতু হিসেবে ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি মাসকে ধরা হয়। মিলনের তিন থেকে চার মাস পরে স্ত্রী অজগর ডিম পাড়ে। স্ত্রী অজগর ডিমগুলোর চারদিকে কুণ্ডলী পাকিয়ে দীর্ঘ সময় তা দিয়ে উষ্ণতা বজায় রাখে, যা এক অসাধারণ মাতৃসুলভ আচরণ। তবে ডিম ফুটে বাচ্চা বের হওয়ার পর মা আর কোনো পরিচর্যা করে না, বাচ্চাগুলো জন্মের পর থেকেই স্বাধীনভাবে জীবন শুরু করে। অজগরের চামড়ার আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যাপক চাহিদা থাকায় চোরাচালান ও চামড়া সংগ্রহের লোভেই এই প্রাণী আজ বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে। তাই এদের অস্তিত্ব রক্ষায় সচেতনতা বৃদ্ধি এবং আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করা বর্তমান সময়ের বড় প্রয়োজন। পরিশেষে বলা যায়, অজগর কেবল একটি সাপের প্রজাতি নয়, বরং বাস্তুসংস্থানের ভারসাম্য রক্ষার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ, যার যথাযথ সংরক্ষণ আমাদের প্রকৃতির বৈচিত্র্যময় সৌন্দর্যকে টিকিয়ে রাখতে জরুরি।